প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
অপরিকল্পিত শিল্পায়নে আশুলিয়া-সাভার সংকটে
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ঢাকার অদূরের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল আশুলিয়া ও সাভার বর্তমানে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের চাপে বহুমাত্রিক সংকটে পড়েছে। পরিবেশ দূষণ, তীব্র জলাবদ্ধতা, অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ বসতি এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এখানকার জনজীবন।গত দুই দশকে তৈরি পোশাক শিল্পের দ্রুত বিস্তারের ফলে আশুলিয়া ও সাভারে গড়ে উঠেছে শত শত শিল্পকারখানা, শ্রমিক আবাসন ও বহুতল ভবন। দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এই শিল্পায়ন হয়েছে পরিকল্পনাহীনভাবে। ফলে গ্রামীণ এলাকা দ্রুত ঘনবসতিপূর্ণ নগরীতে রূপ নিলেও প্রয়োজনীয় সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও নাগরিক নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ কারখানায় কার্যকর বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা না থাকায় কেমিক্যালযুক্ত তরল বর্জ্য সরাসরি খাল-বিল ও তুরাগ নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে জলাশয়গুলো মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে এবং মাছের উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও পুষ্টির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি দূষিত পানি কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ায় ফসল উৎপাদনেও ক্ষতি হচ্ছে।অপরদিকে, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। কোথাও কোথাও পানি কয়েক ঘণ্টা থেকে শুরু করে কয়েক দিন এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এতে প্রতিদিন দুর্ভোগে পড়ছেন হাজার হাজার শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। কর্মস্থলে পৌঁছাতে বিলম্ব, যানবাহন সংকট এবং নোংরা পানিতে চলাচলের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।জামগড়া এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, “আগে এখানে মাছ ধরতাম, ধান চাষ করতাম। এখন বাতাসে দুর্গন্ধ, রাস্তায় হাঁটা দায়। উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু সেই শান্তি আর নেই।”এদিকে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট করে গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত শ্রমিক আবাসন ও সেমিপাকা বসতি। এসব স্থাপনার অধিকাংশেরই নেই অনুমোদন কিংবা পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। সরু রাস্তা ও অপর্যাপ্ত প্রবেশপথের কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ইউনিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি ফরিদুল ইসলাম বলেন, “অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে। কারখানার বর্জ্যে পানি দূষিত হচ্ছে, কৃষি ও মৎস্য খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় শ্রমিকদের দৈনন্দিন যাতায়াতে ভোগান্তি বাড়ছে।” তিনি পরিকল্পিত শিল্পায়ন, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ এবং পরিবেশবান্ধব কারখানা নিশ্চিত করার দাবি জানান।সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন খান নঈম বলেন, “পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নদী-নালা, খাল-বিল দখল ও দূষণ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সব ধরনের স্থাপনা বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে।”ডিইপিজেড ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার প্রণব চৌধুরী জানান, দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় জরুরি সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে সরু রাস্তা ও ঘনবসতির কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে, যা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আশুলিয়া ও সাভারের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। শিল্পকারখানায় বর্জ্য পরিশোধন বাধ্যতামূলক করা, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ, জলাশয় সংরক্ষণ এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে আশুলিয়া-সাভারকে একটি পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পাঞ্চলে রূপ দেওয়া সম্ভব।
প্রকাশক: লিটন মাহমুদ
প্রধান সম্পাদক: মো: আল-আমীন (পনির)
নির্বাহী সম্পাদক: শেখ ফরিদ
কপিরাইট © ২০২৫ ঢাকার কণ্ঠ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত