রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার প্রথম প্রতিবাদ আমিই করেছি। আমিই সবার আগে প্রতিবাদ জানিয়েছি। এর রেকর্ড আছে। জুলাই আন্দোলনে আমি কোথাও বিপক্ষে কাজ করিনি। আমি আন্দোলনকে সমর্থন করেছি বলে আদালতে দাবি করেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় মুস্তাঈন বিল্লাহ সাব্বিরকে হত্যাচেষ্টার মামলায় নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তার দেখানো-সংক্রান্ত শুনানির জন্য তাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালত তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন। শুনানিকালে তিনি এসব দাবি করেন। গত ২৮ জুলাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবু সাঈদ আসামি কলিমউল্লাহকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। ওইদিন আদালত আসামির উপস্থিতিতে শুনানির জন্য আজ বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন। বেলা আড়াইটার দিকে পুলিশ কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে সিএমএম আদালতের হাজতখানা থেকে তাকে এজলাসে তোলে। এরপর তাকে আদালতের কাঠগড়ায় রাখা হয়। কিছুক্ষণ পর বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবু সাঈদ বলেন, ‘তার এ মামলায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রার্থনা করছি।’ এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, ‘তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক।’ এ সময় কলিমউল্লাহ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে বলেন, ‘সাবেক না, সাবেক না। আমি এখনও অধ্যাপক।’ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা আরও বলেন, ‘তিনি একটি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে ছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বানানোর অন্যতম কারিগর এই কুশীলব বুদ্ধিজীবী। তিনি দিনের ভোট রাতে করার বৈধতা দিয়েছেন। আজকের এই আসামি শেখ হাসিনার একজন সুবিধাভোগী। এ রকম কলঙ্কজনক শিক্ষকের জন্য আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা লাগে। জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের মিছিলে গুলি করা ও তাদের লাশ গুমের কার্যক্রমেও এই কলিমউল্লাহ জড়িত। গত ১৯ জুলাই রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার এলাকায় এ মামলার ভিকটিম গুলিবিদ্ধ হন। এ মামলায় তার সংশ্লিষ্টতা থাকায় তদন্ত কর্মকর্তা তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন জানিয়েছেন। আমি এ আবেদনে সমর্থন জানাচ্ছি।’ এর বিরোধিতা করে আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রশীদ বলেন, ‘উনি একজন অধ্যাপক। তার নিজস্ব চিন্তা-চেতনা আছে। তার কাজ শিক্ষকতা করা, গুলি চালানো নয়। এ মামলায় ৯০ জন আসামি আছে। কিন্তু তার নাম ৬১-৬২ নম্বরে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মামলায় কারাগারে আছেন। সেগুলোতেও এখন জামিনে। হঠাৎ এতদিন পর কেন তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হলো, আমার বোধগম্য নয়। হাইকোর্ট থেকে জামিনের ৩০ ঘণ্টা পর আবারও তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন এসেছে। নির্বাচনকালীন দায়িত্বের কথা এতদিন পর টেনে আনা যুক্তিহীন। নিয়ম অনুযায়ী ঘটনার এক বছর পর শোন অ্যারেস্ট দেখানো যায় না। এটা দুই বছর আগের মামলা। তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। আমরা এর বিরোধিতা করছি।’ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কলিমউল্লাহ আদালতের কাছে কথা বলার অনুমতি চান। এ সময় আদালত তাকে এক মিনিটের জন্য কথা বলার অনুমতি দেন। এ সময় কলিমউল্লাহ বলেন, ‘নির্বাচনে আমি যা দেখেছি তাই বলেছি। এখানে আমার কোনো দোষ নেই। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আমার দায়িত্ব ছিল। এর আগে-পরে কিছু হয়েছে কি না, সেটা তো আমার জানার কথা নয়।’ এরপর বিচারক বলেন, ‘এটা তো আপনার দায়িত্ব। আগে-পরের ঘটনাও জানা উচিত ছিল।’ কলিমউল্লাহ আরও বলেন, ‘আমিই আবু সাঈদের হত্যার প্রথম প্রতিবাদ করেছি। আমিই সবার আগে প্রতিবাদ জানিয়েছি। এর রেকর্ড আছে। জুলাই আন্দোলনে আমি কোথাও বিপক্ষে কাজ করিনি। আমি আন্দোলনকে সমর্থন করেছি।’ তখন বিচারক বলেন, ‘আপনার নির্বাচনী আর্টিকেল আমিও পড়েছি। তদন্তের স্বার্থে আপনাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো। আপনি এ মামলায় কারাগারে যাবেন।’ শুনানি শেষে আবারও তাকে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ওইদিনই জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে আটক রয়েছেন।