ঢাকার কণ্ঠ

১৪ শিকের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চান জনি চন্দ্র সূত্রধর, আদালতে খোলা চিঠি

আমি মুক্তি চাই, আমি মুক্তি চাই। দীর্ঘ ১৩ মাস বিনা দোষে, শুধু সংখ্যালঘু বাংলাদেশী হওয়ার কারণে মিথ্যা ৯টি ডিটেনশনসহ রাষ্ট্রদ্রোহের সাজানো মামলা দিয়ে প্রশাসন আমাকে কারাগারে আটক করে রেখেছে বলে খোলা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উৎখাত ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অভিযোগে করা এক মামলার আসামি জনি চন্দ্র সূত্রধর ওরফে জনি নাথ। সোমবার (৯ মার্চ) জয় বাংলা ব্রিগেড’র জুম মিটিংয়ে অংশ নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উৎখাত ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জনের মামলায় চার্জগঠন বিষয়ে শুনানির জন্য দিন নির্ধারণ ছিলো। একারণে এই কারাগার থেকে জনি চন্দ্র সূত্রধর ওরফে ওনি নাথসহ ৩০ জন আসামিকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। বেলা সোয়া ২ টায় আসামিদের ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মঈন উদ্দিন চৌধুরীর আদালতের এজলাসে ওঠানো হয়। এরপর চার্জগঠন বিষয়ে শুনানি শুরু। তবে আসামি পক্ষের একাধিক আইনজীবীরা চার্জগঠন বিষয়ে শুনানির পেছানোর জন্য সময়ের আবেদন করেন। আদালত সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ১৫ এপ্রিল পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন। এরপর বিকেল পৌনে চারটার দিকে এজলাস থেকে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী মধ্যে দিয়ে আসামিদের হাজতখানায় নেওয়া হয়। এসময় এই মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৮২ নম্বর আসামি জনি চন্দ্র সূত্রধর ওরফে জনি নাথ সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে তার হাতে থাকে একটি খোলা চিঠি ছুঁড়ে মারেন। তখন আসামি জনি চন্দ্র সূত্রধর চিৎকার করে বলতে থাকেন, আমি শুধুমাত্র হিন্দু হওয়ার কারণে পর পর ৯টি মামলা দিয়েছে। শুধুমাত্র সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে। এরপর দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তার মুখ চেপে ধরে হাজতখানায় নিয়ে যায়। আসামি জনি চন্দ্র সূত্রধর তার খোলা চিঠিতে উল্লেখ করেন, আমি মুক্তি চাই, আমি মুক্তি চাই দীর্ঘ ১৩ মাস বিনা দোষে, শুধু হিন্দু বাংলাদেশী হওয়ার কারণে মিথ্যা ৯টি ডিটেনশনসহ রাষ্ট্রদ্রোহের সাজানো মামলা দিয়ে প্রশাসন আমাকে কারাগারে আটক করে রেখেছে। চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ থানায় আমার কোন রাজনৈতিক পদবি, সহ কোন মিটিং মিছিলের কোন ছবি এখনো পর্যন্ত প্রমাণ করতে পারেনি প্রশাসন। মিথ্যা সাজানো মামলা দিয়ে আমার ক্যারিয়ার  পরিবার, বাচ্চার ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে। প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবো আমার কোন রাজনৈতিক পরিচয় নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্টমন্ত্রীর কাছে সাহস কামনা করছি সুষ্ট তদন্ত করে আমার মুক্তি চাই। আমি কি বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘু হওয়াতে পাপ হয়ে গেছে? একজন সামান্য ওষুধ কোম্পানির এস আর এল (আমি জনি সূত্র ধর, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম) মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। আমি বাঁচতে চাই। এ বিষয়ে জানতে চেয়ে জনি সূত্রধরের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জনি সূত্র ধরের স্ত্রী তৃষ্ণা সূত্রধর বলেন, ২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি আমাদের বাড়ি থেকে আমার স্বামীকে সন্দ্বীপ থানার পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। থানার নেওয়ার সময় আমাদের পুলিশ জানায় ওসি স্যার দেখা করতে বলেছেন। ওসি স্যারের সাথে কথা শেষ হলে কাল সকালে আপনার স্বামীকে ছেড়ে দেওয়া হবে। মিথ্যা কথা বলে আমার স্বামীর বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ৯টি মামলা দেওয়া হয়েছে। আমার স্বামী কারাগারে আটক থাকায় বাপের বাড়িতে দিন কাটছে। ছোট্ট ছেলের বয়স ৫ বছর হলেও এখানো স্কুলে দিতে পারিনি। অনেক কষ্ট দিন কাটছে। খেয়ে না খেয়ে। মিথ্যা মামলার কারণ আমার পরিবার আজকে পথে বসেছে। তিনি আরও বলেন, আমার পরিবার অনেক নিম্ন আয়ে চলে। মামলা চালানোর মত টাকা পয়সা নেই। এই পর্যন্ত মানুষের কাছে অনেক টাকা পয়সা ধার নিয়ে ৭টা মামলায় জামিন করেছি। সব কিছুই বিক্রয় করা শেষ। এখন একবারেই নিঃস্ব। আরও দুইটা মামলা আছে। আইনজীবী ধরার মত কোন টাকা পয়সাও নেই। আর ঢাকাতে কেউ নেই আমাদের। গত সাত মাস ধরে আমার স্বামীর সঙ্গে দেখা হয়নি। গত সাত মাস ধরে আমার ছোট্ট ছেলেটা তার বাবার জন্য কান্নাকাটি করে। আমরা বাঁচতে চাই। আমার স্বামীর জামিন চাই।  এদিকে জনি চন্দ্র সূত্রধরের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন ও ওবায়দুল জানান, এই মামলায় প্রায় ৬ মাস আগে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তিনি এই মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৮২ নম্বর আসামি। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ নেই। তারপরও তার জামিন দিচ্ছে না। শুধু জনি চন্দ্র সূত্রধর না এই মামলায় সকল আসামিই জামিন পাওয়ার হকদার। আশা করি, আদালত ন্যায় বিচার করবেন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানার ইনচার্জ মো. রিপন মোল্লা বলেন, আসামি জনি চন্দ্র সূত্রধর ওরফে জনি নাথ বাংলা ব্রিগেড’র জুম মিটিংয়ে অংশ নিয়ে অন্তরর্তীকালীন সরকারকে উৎখাত ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অভিযোগে করা মামলার আসামি। তাকে আজকে আদালতে উপস্থিত করা হয়েছিলো। প্রসঙ্গ, ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ শেখ হাসিনাসহ ৭৩ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আদালতে মামলাটি করেন সিআইডির সহকারী বিশেষ পুলিশ সুপার মো. এনামুল হক। তদন্ত শেষে গত ৩০ জুলাই শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তিনি। ১৪ অগাস্ট অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। গত ১১ সেপ্টেম্বর আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ১৪ অক্টোবর শেখ হাসিনাসহ পলাতক ২৬১ জনকে  আদালতে হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ দেন। পরবর্তী ১১ নভেম্বর মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ড. রাব্বী আলমের নেতৃত্বে ‘জয় বাংলা ব্রিগেড’-এর জুম মিটিংয়ে শেখ হাসিনাসহ কয়েক শতাধিক নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করেন। এ সময় শেখ হাসিনা তার নেতাকর্মীদের কাছে দেশবিরোধী বক্তব্য দেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে উৎখাতের নির্দেশ দেন। এ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

১৪ শিকের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চান জনি চন্দ্র সূত্রধর, আদালতে খোলা চিঠি