ঢাকার কণ্ঠ

চট্টগ্রাম বিভাগে বন্যায় প্রাণহানি ৩৯, দুর্ভোগে ৯ লাখ মানুষ

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি—এই পাঁচ জেলায় ৯ লাখ ২৮ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক এলাকায় এখনো পানি না নামায় হাজারো পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে, যেখানে মারা গেছেন ২৩ জন। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া চট্টগ্রামে ৮ জন, বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙামাটিতে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।চট্টগ্রাম জেলায় টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ১৬টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতির মুখে পড়েছে। বন্যায় প্লাবিত হয়েছে ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা। দুর্গত মানুষের জন্য ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে ২৩ হাজার ৮৫৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন।সরকার ইতোমধ্যে বন্যাদুর্গতদের জন্য ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বাকি ত্রাণসামগ্রী প্রয়োজন অনুযায়ী বিতরণের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। রাইমস (RIMES) ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের যৌথ সতর্কবার্তায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িকে পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।বন্যার মধ্যেই নতুন করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে। আকস্মিক বন্যার পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে আশিক (১১) ও মিরাজ (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।অন্যদিকে কক্সবাজারে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। জেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট, আর রান্নাঘর ডুবে যাওয়ায় বহু পরিবার খাবার রান্না করতেও পারছে না।বান্দরবানে পাহাড়ধস ও বন্যায় ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। ঝুঁকি বিবেচনায় জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।রাঙামাটিতেও বন্যা ও পাহাড়ধসে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। পাহাড়ি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। তবে সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাজেকে আটকে পড়া ৪৬১ জন পর্যটককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে।দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে দুর্গত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। তিনি দ্রুত উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।স্থানীয়দের দাবি, কেবল ত্রাণ বিতরণ নয়, দুর্গতদের দ্রুত পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থায়ী ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

চট্টগ্রাম বিভাগে বন্যায় প্রাণহানি ৩৯, দুর্ভোগে ৯ লাখ মানুষ