ঢাকার কণ্ঠ

নদীতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু, রাতে পাশাপাশি দাফন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের চর চাকলা গ্রামে এখন শুধুই কান্নার রোল। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার পরিবেশ। একসঙ্গে পাঁচ কন্যাশিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুতে নিভে গেছে তিনটি পরিবারের আলো।শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুর পৌনে ১টার দিকে জুমার নামাজের সময় মরা পাগলা নদীতে গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়। পরে সন্ধ্যায় তাদের মরদেহ উদ্ধার করে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে রাতেই স্থানীয় পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়।নিহত শিশুরা হলো চর চাকলা গ্রামের মাসুদ রানার দুই মেয়ে সুমাইয়া (১০) ও আরিবা (৮), নিজামুদ্দিনের দুই মেয়ে সুমাইয়া (১২) ও সুরাইয়া (৯) এবং শরিফুল ইসলামের মেয়ে শরীফা (১২)।সবচেয়ে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বিদেশে থাকা শিশুদের বাবাদের নিয়ে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শেষবারের মতো সন্তানদের নিথর মুখ দেখানো হয় তাদের। সন্তান হারানোর শোকে বাবাদের কান্না এবং মায়েদের বুকফাটা আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন।স্থানীয়দের ভাষ্য, শুক্রবার জুমার নামাজের সময় গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মসজিদে ছিলেন। এ সময় শিশুরা পরিবারের কাউকে না জানিয়ে নদীতে গোসল করতে নামে। কিছুক্ষণ পর তাদের দেখতে না পেয়ে স্বজনরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে স্থানীয়রা নদীতে নেমে পাঁচ শিশুকে উদ্ধার করেন। তবে ততক্ষণে তাদের মৃত্যু হয়।প্রত্যক্ষদর্শী আকলিমা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, শিশুরা নদীতে গোসল করতে নেমেছিল। হঠাৎ তাদের আর দেখা যাচ্ছিল না। তিনি চিৎকার করে স্থানীয়দের ডাক দিলে তারা দ্রুত নদীতে নেমে শিশুদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন। কিন্তু কাউকেই জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।দেবীনগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মজিবুর রহমান জানান, চর চাকলা গ্রামের পাশের নদীটি স্থানীয়ভাবে ‘মরা পাগলা নদী’ নামে পরিচিত। এটি পদ্মা নদীর একটি শাখা। বর্ষা ও বৃষ্টির সময় পদ্মার পানি ঢুকে নদীটি পানিতে ভরে যায়। বছরের অন্য সময় এখানে তেমন পানি থাকে না।তিনি বলেন, কয়েক দিনের বৃষ্টি ও পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে সম্প্রতি মরা পাগলা নদীতে পানির পরিমাণ বেড়ে যায়। শুক্রবার দুপুরে শিশুরা মা-বাবার অজান্তে সেখানে গোসল করতে নেমে এই দুর্ঘটনার শিকার হয়।দেবীনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. হাফিজুর রহমান বলেন, কয়েকজন শিশু নদীতে গোসল করতে নেমেছিল। একপর্যায়ে তারা একে একে পানিতে ডুবে যায়। পরে স্থানীয়রা তল্লাশি চালিয়ে তাদের মরদেহ উদ্ধার করেন। একই ঘটনায় পাঁচ শিশুর মৃত্যু এ গ্রামে আগে কখনো ঘটেনি।দেবীনগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সমাজসেবক আব্দুর রহমান বিশ্বাস বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে চর চাকলা গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে পাঁচ শিশুকে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। একসঙ্গে পাঁচটি কবর খোঁড়ার এমন ঘটনা এর আগে কখনো দেখা যায়নি।স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান অভিযোগ করেন, প্রতিবছরই এ এলাকায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হলেও উদ্ধারকর্মীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে অনেক সময় এক থেকে দেড় ঘণ্টা লেগে যায়। এলাকায় প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী না থাকায় দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি করেন তিনি।স্থানীয় বাসিন্দা শুকুরদ্দি বিশ্বাস বলেন, তাদের গ্রামে যেতে একটি নদী পার হতে হয়। গ্রাম পর্যন্ত পাকা রাস্তাও নেই। প্রতিবছর পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও কার্যকর প্রতিকার হচ্ছে না। শিশুদের পরিবারের সদস্যরা নজরে রাখার চেষ্টা করলেও তারা চোখের আড়াল হলেই দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানান তিনি।চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ পাঁচ শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বন্যার পানিতে গোসল করতে নেমে তাদের মৃত্যু হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে রাতে মরদেহগুলো পাশাপাশি দাফন করা হয়।চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল রাজন জানান, নিহত শিশুদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানানো হয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছে। পানিতে ডুবে মৃত্যু কমাতে বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে। মসজিদ ও বিদ্যালয়কেন্দ্রিকভাবেও পানিতে ডুবে মৃত্যু ও বজ্রপাত সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।তবে দুর্গম এলাকায় স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী এবং শিশুদের সাঁতার শেখানোর কার্যক্রম বর্তমানে চালু নেই বলে জানান ইউএনও। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।এদিকে পাঁচ শিশুর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল শোকবার্তায় শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং নিহত শিশুদের জন্য দোয়া করেন।বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশিদও এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জুমার সময় পুরো গ্রামে নেমে এসেছে নীরব হাহাকার। নদীর পানিতে গোসল করতে গিয়ে পাঁচ শিশুর প্রাণহানি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মো. মুশা বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। সন্তানহারা পরিবারগুলোর শোক সহ্য করার শক্তির জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি। এসব পরিবারকে সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।তিনি অভিভাবকদের সন্তানদের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাঁতারে দক্ষ করে তোলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্থানীয় সমাজসেবক, শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিদের শিশুদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে উৎসাহিত করার কথাও বলেন তিনি।পাঁচ শিশুর এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে চর চাকলা গ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোক। যে বাড়িগুলোতে কিছুদিন আগেও শিশুদের হাসি-খেলায় মুখর ছিল, সেখানে এখন শুধু স্বজনদের কান্না আর শূন্যতা।

নদীতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু, রাতে পাশাপাশি দাফন