২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ভয়াবহ শিল্প বিপর্যয়ের দিন। সাভারে সেদিন আটতলা ভবন ধসে নিহত হন সহস্রাধিক পোশাক শ্রমিক। আহত হন দুই হাজারের বেশি। এ ঘটনার ১৩ পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি মামলাগুলোর বিচার। অধিকাংশই আটকে আছে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে।ভবন ধসে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোট ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে অবহেলার কারণে মৃত্যু উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করে পুলিশ, ইমারত নির্মাণ আইন না মেনে ভবন নির্মাণ করায় একটি মামলা করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ভবন নির্মাণে দুর্নীতি ও সম্পদের তথ্য গোপনসংক্রান্ত দুটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), অস্ত্র এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা হয় আরো দুটি মামলা।এসব মামলার মধ্যে কেবল দুদকের দায়ের করা সম্পদের তথ্য গোপনের একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর বাইরে ভবন নির্মাণে দুর্নীতির মামলাটি যুক্তিতর্ক শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। বাকি তিনটি মামলা রয়েছে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে। আরেকটি মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা ও ইমারত আইনের মামলা দুটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হয় ২০১৬ সালে। একই বছরের ১৫ মার্চ মামলা দুটি বিচার ও নিষ্পত্তির জন্য ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ এবং বিচারিক আদালতে পাঠানো হয়। একই বছরের ১৬ জুন ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। এরপর ১৮ জুলাই হত্যা মামলায় ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন ঢাকার তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ এস এম কুদ্দুস জামান।রানা প্লাজা ধসের পরদিন অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে একটি মামলা করেন সাভার থানার উপপরিদর্শক আলী আশরাফ। ওই মামলায় সোহেল রানাসহ ২১ জনকে আসামি করা হয়। এ ছাড়া রানা প্লাজা ধসে নিহত হওয়ার ঘটনাকে হত্যাকারী আখ্যায়িত করে আদালতে আরেকটি মামলা করেন গার্মেন্ট শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী শিউলি আক্তার। আদালতের নির্দেশে এটিকে অবহেলাজনিত মৃত্যু মামলার সঙ্গে একীভূত করে তদন্ত করে সিআইডি। আদালতে দায়ের করা হত্যা মামলার বাদী শিউলি আক্তার এখন পুলিশের মামলার সাক্ষী। এ মামলায় মোট ৫৯৪ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।২০১৬ সালের ১৮ জুলাই এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। চার্জশিটভুক্ত ৪১ আসামিদের মধ্যে সোহেল রানা কারাগারে। আসামি রানার বাবা আব্দুল খালেক ও তার মা মর্জিনা বেগমের মৃত্যু হয়। বর্তমানে সাভার পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. রেফাত উল্লাহসহ মোট ১৩ জন আসামি পলাতক রয়েছেন এবং বাকি ২৫ জন আসামি বিভিন্ন সময় হাইকোর্ট থেকে জামিনে রয়েছেন।বর্তমানে মামলাটি ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মুহাম্মদ মুনির হোসাঈনের আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ মামলায় মোট ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেছে আদালত। সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ মামলাটির তিনজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আগামী ৩০ এপ্রিল মামলাটির পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম সজীব এসব তথ্য জানান।হত্যা মামলাটির সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফয়সাল মাহমুদ জানান, তৎকালীন সরকারের মামলাটি নিয়ে সদিচ্ছার অভাব ছিল বলে মনে হয়। এটাকে পুঁজি করে তারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেছে। দিনের পর দিন রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কোনো ইনিশিয়েটিভ নেওয়া হয়নি। আমরা বিগত দেড় বছরে প্রোগ্রেস করেছি। ১০০ জনের বেশি সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এখন সাক্ষ্যগ্রহণের সর্বশেষ ধাপে আছি। আশা করছি খুব দ্রুত আমরা হয়তো একটা ভার্ডিক্ট পেতে যাচ্ছি। চলতি বছরের মধ্যেই একটা কিছু (রায়) হতে পারে বলে দাবি করে এই আইনজীবী।তিনি আরো বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ৫৯৪ জন সাক্ষীরে মধ্যে ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেছি। আরো কিছু সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া লাগতে পারে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলাটির বিচার দ্রত শেষ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আশা করছি খুব শিগ্গিরই মামলাটির বিচার শেষ হবে এবং ভিকটিম পরিবার ন্যায়বিচার পাবে।’এ বিষয়ে রানার আইনজীবী মাসুদ খান খোকন আমার দেশকে বলেন, ‘মাসুদ রানার প্রতিটি মামলা চলমান। আর যে কজন সাক্ষী আছে, তারা আসুক। সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষ হোক। আমি চাই দ্রুত একটা সমাধান হোক। রানা সম্পূর্ণ নির্দোষ ও নিরপরাধ। আমি রানার খালস চাই, আর খালাস না হলে বিচার শেষে সাজা হবে। এই আসামি রানা আর কত দিন জেল খাটবেন? আসামি যাতে ন্যায়বিচার পান, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। রানার হাজতবাস প্রায় ১৩ বছর। তিনি নির্দোষ ও নিরপরাধ, কারণ বিচার এখনো চলমান। হত্যা মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিটে ৪১ জনকে আসামি করেন। সাক্ষী ছিলেন ৫৯৪ জন। বিভিন্ন সময়ে এই মামলায় ১৪৫ জন সাক্ষী হয়েছেন। এখনো সাক্ষীর জন্য দিন ধার্য আছে। সাক্ষ্য শেষ হচ্ছে না, রানার হাজতবাসও শেষ হচ্ছে না। এখনো সাক্ষ্য-প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আনতে পারে নাই। রানাকে জামিন দিক অথবা দ্রুত বিচার শেষ করুক, এটাই আমাদের প্রত্যশা ‘