ঢাকার কণ্ঠ

তিন দেশে বিশ্বকাপের উদ্বোধন, শুরু হচ্ছে ফুটবলের মহাযজ্ঞ

ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম সংস্করণের পর্দা উঠছে আজ। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮ দল নিয়ে আয়োজিত হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিনটি দেশে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায়। একই সঙ্গে তিন দেশের যৌথ আয়োজনে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘটনাও এটিই প্রথম।বৃহস্পতিবার (১১ জুন) মেক্সিকোর ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব। দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময়ব্যাপী এই ফুটবল উৎসবের পর্দা নামবে আগামী ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের মাধ্যমে।চার বছর পরপর বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলেও এবার ব্যবধানটা কিছুটা কম। ২০২২ সালে কাতারে শীতকালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের পর প্রায় সাড়ে তিন বছর ব্যবধানে আবারও জুন মাসেই ফিরছে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতা।বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম তিনটি আয়োজক দেশে সমান্তরালভাবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে নিজ নিজ উদ্বোধনী ম্যাচের ৯০ মিনিট আগে শুরু হবে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। আলাদা আয়োজন হলেও একটি অভিন্ন বার্তা থাকবে সব অনুষ্ঠানে ফুটবলের মাধ্যমে সীমান্ত, সংস্কৃতি ও ভাষার বিভেদ পেরিয়ে বিশ্বকে একসূত্রে গাঁথা।দলসংখ্যা ৩২ থেকে বেড়ে ৪৮ হওয়ায় এবার ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বিশ্বকাপে মোট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ১০৪টি। এর মধ্যে ৭৮টি ম্যাচ হবে যুক্তরাষ্ট্রে, আর মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হবে ১৩টি করে ম্যাচ।মোট ১৬টি স্টেডিয়ামে গড়াবে আসরের লড়াই। এর মধ্যে মেক্সিকোতে ৩টি, কানাডায় ২টি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১১টি স্টেডিয়াম ব্যবহৃত হবে। উদ্বোধনী ম্যাচ হবে মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে, আর শিরোপা নির্ধারণী ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণ মেক্সিকোর কিংবদন্তি আজতেকা স্টেডিয়াম। ফুটবল ইতিহাসের দুই মহাতারকা ব্রাজিলের পেলে ও আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা এই মাঠেই বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। ১৯৭০ সালে পেলের ব্রাজিল এবং ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা এই মাঠ থেকেই বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়েছিল।ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’-র সাক্ষীও এই স্টেডিয়াম। ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালের পর এবার তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করে নতুন ইতিহাস বিশ্বকাপ মানেই তারকাদের মিলনমেলা। এবারের আসরেও নজর থাকবে লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নেইমার, কিলিয়ান এমবাপে, হ্যারি কেইন, লামিনে ইয়ামাল ও আরলিং হালান্ডদের দিকে।চোট কাটিয়ে প্রস্তুতি ম্যাচে গোল করে মাঠে ফিরেছেন মেসি। ব্রাজিলের স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন নেইমারও। অন্যদিকে ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ স্মরণীয় করে রাখতে মুখিয়ে আছেন রোনালদো। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে নামা ইয়ামাল ও হালান্ডের পারফরম্যান্স নিয়েও ভক্তদের আগ্রহ তুঙ্গে।এদিকে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা শিরোপা ধরে রাখতে পারে কি না, কিংবা ব্রাজিল বহু প্রতীক্ষিত ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জিততে পারে কি না—সেসব প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে ফুটবলপ্রেমীদের মনে।বিশ্বকাপের আগে ফুটবলের বেশ কিছু নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হবে রাউন্ড অব ৩২। বদলি খেলোয়াড়দের দ্রুত মাঠে নামানোর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ সেকেন্ড সময়সীমা। বদলি হওয়া খেলোয়াড়কে নিকটবর্তী সীমানা রেখা দিয়ে মাঠ ছাড়তে হবে; অযথা সময় নষ্ট করলে দলকে সাময়িকভাবে ১০ জন নিয়ে খেলতে হতে পারে।থ্রো-ইন নিতে পাঁচ সেকেন্ডের বেশি সময় নিলে বল প্রতিপক্ষের দখলে যাবে। ছোটখাটো চিকিৎসার প্রয়োজন হলে গোলরক্ষক ছাড়া অন্য খেলোয়াড়কে এক মিনিটের জন্য মাঠের বাইরে থাকতে হবে। রেফারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে মাঠ ছাড়লে কিংবা বাইরের কেউ খেলোয়াড়দের উসকানি দিলে লাল কার্ডের শাস্তিও হতে পারে।ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থাতেও এসেছে নতুন সংযোজন। ভুল কর্নার কিকের সিদ্ধান্ত, দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের ক্ষেত্রে ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়া এবং নির্দিষ্ট কিছু ফাউলের ঘটনা এখন আরও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা যাবে।বিশ্বকাপের মতো বড় আসরের সঙ্গে বিতর্কও যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। এবারের আসর শুরুর আগেই টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমর্থকরা।এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়েও তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। শেষ পর্যন্ত তারা অংশ নিলেও দলের কয়েকজন সদস্য এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতান যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে জটিলতার মুখে পড়েছেন। নিরাপত্তা তল্লাশির নামে ইতালির বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ফ্যাবিও ক্যানাভারোকেও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।সব বিতর্ক, জল্পনা-কল্পনা ও প্রত্যাশার মাঝেই আজ শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসব। আগামী এক মাসের বেশি সময় ধরে বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের চোখ থাকবে উত্তর আমেরিকার তিন দেশের মাঠে, যেখানে নতুন ইতিহাস লেখার অপেক্ষায় ৪৮টি দল।

তিন দেশে বিশ্বকাপের উদ্বোধন, শুরু হচ্ছে ফুটবলের মহাযজ্ঞ