র্যাব-১ কার্যালয়ের কথিত গোপন বন্দিশালা ‘টিএফআই সেল’-এ বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে একটি কক্ষে আটকে রাখার পর তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।
শনিবার (১ আগস্ট) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের নিয়ে র্যাব-১-এর টিএফআই সেল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ দাবি করেন।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং ভুক্তভোগীদের বর্ণনার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কক্ষটি শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধির রুল ৪৬এ, রোম সংবিধির সংশ্লিষ্ট বিধান এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারকদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশনের আবেদনের পর ট্রাইব্যুনাল এই বিচারিক পরিদর্শনের অনুমতি দেয়।
তার ভাষ্য, এতদিন ‘আয়নাঘর’ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা হলেও বিচারকদের শুধু নথি বা সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর না করে ঘটনাস্থল সরেজমিনে দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিদর্শনের পর্যবেক্ষণ একটি মেমোরেন্ডামে সংরক্ষণ করা হবে, যা মামলার বিচারিক নথির অংশ হবে।
পরিদর্শনে ভবনের ভেতরে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২২টি কক্ষের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। তার দাবি, কয়েকটি কক্ষ এতটাই ছোট যে সেখানে একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে শুয়ে থাকাও সম্ভব নয়। তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী, এসব কক্ষে ব্যক্তিদের হাত ও চোখ বেঁধে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হতো এবং তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে। পরে অনেককে বিভিন্ন মামলায় আদালতে সোপর্দ করা হলেও অনেকে আর ফিরে আসেননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াই শতাধিক গুম হওয়া ব্যক্তির কোনো সন্ধান মেলেনি। তাদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীসহ আরও অনেকে রয়েছেন। গত বছরের আগস্টের পর ফিরে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগীর বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে আয়নাঘরের কয়েকটি নির্দিষ্ট কক্ষ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ব্যারিস্টার আরমানকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল বলে তিনি বর্ণনা দিয়েছেন, সেটিও তদন্তকারীরা শনাক্ত করেছেন। একইভাবে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে র্যাব-১-এর এই স্থাপনায় একটি কক্ষে আটকে রাখার এবং পরে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার তথ্যও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, র্যাব-১-এর টিএফআই সেল পরিদর্শনের পর এবার ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট কথিত আরেকটি গোপন আটককেন্দ্র জেআইসি পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের আবেদনের ভিত্তিতে আগামী শনিবার বিচারকেরা সেখানে বিচারিক পরিদর্শনে যাবেন।
আইনগত বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাউকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হয় এবং গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে হয়। একই বাধ্যবাধকতা রয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারায়। তবে আয়নাঘরে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব সাংবিধানিক ও আইনি বিধান অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, অবৈধভাবে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা, গুম, নির্যাতন ও হত্যার মতো অভিযোগ শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়; এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এসব অভিযোগে বিচার চলছে এবং আরও বিভিন্ন ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
পরিদর্শনের সময় ভবনের বিভিন্ন অংশে নতুন দেয়াল তুলে আগের কাঠামো আড়াল করার চেষ্টার আলামত পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, তদন্তের শুরুতে ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে ঘটনাস্থলের মিল পাওয়া না গেলে কয়েকটি নতুন দেয়াল অপসারণ করা হয়। এরপর আড়ালে থাকা কক্ষগুলো বেরিয়ে আসে এবং সেখানে বিভিন্ন আলামত পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, ভবনের নিচতলার একটি কক্ষকে ভুক্তভোগীরা ‘ডেথ সেল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নিচে ও ওপরে মিলিয়ে মোট ২২টি কক্ষ পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় কোনো বৈধ প্রয়োজনে ব্যবহার না হলে এতগুলো ছোট ছোট কক্ষ কেন নির্মাণ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের জবাব দিতে হবে।
আমিনুল ইসলাম জানান, পরবর্তীকালে দেয়াল তুলে বা নতুন নির্মাণের মাধ্যমে যারা এসব কক্ষের অস্তিত্ব গোপন করার চেষ্টা করেছেন, তাদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। প্রমাণ নষ্ট বা আড়াল করার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে বিচার পরিচালনায় প্রসিকিউশন অঙ্গীকারবদ্ধ। তার দাবি, ‘আয়নাঘর’ কোনো রূপকথার গল্প নয়, বরং একটি বাস্তবতা। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জড়িতদের পাশাপাশি যাদের নির্দেশে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে এবং সে সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়ও ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ নীতির আওতায় তদন্তে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিষয় : সালাহউদ্দিন টিএফআই সেল

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬
র্যাব-১ কার্যালয়ের কথিত গোপন বন্দিশালা ‘টিএফআই সেল’-এ বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে একটি কক্ষে আটকে রাখার পর তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।
শনিবার (১ আগস্ট) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের নিয়ে র্যাব-১-এর টিএফআই সেল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ দাবি করেন।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং ভুক্তভোগীদের বর্ণনার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কক্ষটি শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধির রুল ৪৬এ, রোম সংবিধির সংশ্লিষ্ট বিধান এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারকদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশনের আবেদনের পর ট্রাইব্যুনাল এই বিচারিক পরিদর্শনের অনুমতি দেয়।
তার ভাষ্য, এতদিন ‘আয়নাঘর’ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা হলেও বিচারকদের শুধু নথি বা সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর না করে ঘটনাস্থল সরেজমিনে দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিদর্শনের পর্যবেক্ষণ একটি মেমোরেন্ডামে সংরক্ষণ করা হবে, যা মামলার বিচারিক নথির অংশ হবে।
পরিদর্শনে ভবনের ভেতরে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২২টি কক্ষের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। তার দাবি, কয়েকটি কক্ষ এতটাই ছোট যে সেখানে একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে শুয়ে থাকাও সম্ভব নয়। তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী, এসব কক্ষে ব্যক্তিদের হাত ও চোখ বেঁধে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হতো এবং তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে। পরে অনেককে বিভিন্ন মামলায় আদালতে সোপর্দ করা হলেও অনেকে আর ফিরে আসেননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াই শতাধিক গুম হওয়া ব্যক্তির কোনো সন্ধান মেলেনি। তাদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীসহ আরও অনেকে রয়েছেন। গত বছরের আগস্টের পর ফিরে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগীর বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে আয়নাঘরের কয়েকটি নির্দিষ্ট কক্ষ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ব্যারিস্টার আরমানকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল বলে তিনি বর্ণনা দিয়েছেন, সেটিও তদন্তকারীরা শনাক্ত করেছেন। একইভাবে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে র্যাব-১-এর এই স্থাপনায় একটি কক্ষে আটকে রাখার এবং পরে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার তথ্যও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, র্যাব-১-এর টিএফআই সেল পরিদর্শনের পর এবার ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট কথিত আরেকটি গোপন আটককেন্দ্র জেআইসি পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের আবেদনের ভিত্তিতে আগামী শনিবার বিচারকেরা সেখানে বিচারিক পরিদর্শনে যাবেন।
আইনগত বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাউকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হয় এবং গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে হয়। একই বাধ্যবাধকতা রয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারায়। তবে আয়নাঘরে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব সাংবিধানিক ও আইনি বিধান অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, অবৈধভাবে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা, গুম, নির্যাতন ও হত্যার মতো অভিযোগ শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়; এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এসব অভিযোগে বিচার চলছে এবং আরও বিভিন্ন ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
পরিদর্শনের সময় ভবনের বিভিন্ন অংশে নতুন দেয়াল তুলে আগের কাঠামো আড়াল করার চেষ্টার আলামত পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, তদন্তের শুরুতে ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে ঘটনাস্থলের মিল পাওয়া না গেলে কয়েকটি নতুন দেয়াল অপসারণ করা হয়। এরপর আড়ালে থাকা কক্ষগুলো বেরিয়ে আসে এবং সেখানে বিভিন্ন আলামত পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, ভবনের নিচতলার একটি কক্ষকে ভুক্তভোগীরা ‘ডেথ সেল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নিচে ও ওপরে মিলিয়ে মোট ২২টি কক্ষ পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় কোনো বৈধ প্রয়োজনে ব্যবহার না হলে এতগুলো ছোট ছোট কক্ষ কেন নির্মাণ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের জবাব দিতে হবে।
আমিনুল ইসলাম জানান, পরবর্তীকালে দেয়াল তুলে বা নতুন নির্মাণের মাধ্যমে যারা এসব কক্ষের অস্তিত্ব গোপন করার চেষ্টা করেছেন, তাদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। প্রমাণ নষ্ট বা আড়াল করার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে বিচার পরিচালনায় প্রসিকিউশন অঙ্গীকারবদ্ধ। তার দাবি, ‘আয়নাঘর’ কোনো রূপকথার গল্প নয়, বরং একটি বাস্তবতা। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জড়িতদের পাশাপাশি যাদের নির্দেশে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে এবং সে সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়ও ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ নীতির আওতায় তদন্তে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন