২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনে রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার সেই দিনের ঘটনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেছেন শিক্ষার্থী রাতুল হাসান। তার অভিযোগ, তৎকালীন রামপুরা এলাকায় দায়িত্বে থাকা বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলামের নেতৃত্বে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল। সেই গুলিতেই তার বাম পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে বলে জবানবন্দিতে জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেন রাতুল হাসান। তিনি এ মামলার ১২ নম্বর সাক্ষী।
সাক্ষ্যগ্রহণের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন মামলার দুই গ্রেপ্তার আসামি বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম। মামলার অপর দুই আসামি পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান পলাতক রয়েছেন।
জবানবন্দিতে তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী রাতুল হাসান বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বন্ধু রিফাত ইসলামসহ কয়েকজনের সঙ্গে রামপুরার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ওই দিন তার বন্ধু রিফাত পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন।
পরদিন ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর রামপুরা মাল্টিকেয়ার হাসপাতালের সামনে আবারও আন্দোলনে যোগ দেন রাতুল। তার ভাষ্য, তখন আন্দোলনকারীদের সামনে বিজিবি ও পুলিশ অবস্থান করছিল। কোনো ধরনের সতর্কবার্তা ছাড়াই তারা গুলি চালানো শুরু করে।
রাতুল বলেন, গুলি শুরু হলে তিনি বেটার লাইফ হাসপাতালের দিকে দৌড় দেন। এ সময় একটি গুলি তার বাম পায়ের হাঁটুর নিচে পেছন দিক দিয়ে ঢুকে সামনের দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। এতে পায়ের হাড় ক্ষতিগ্রস্ত ও ভেঙে যায়।
পরে ভাগ্নে সুলাইমান ও অন্য আন্দোলনকারীদের সহায়তায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা শেষে ২৫ জুলাই ছাড়পত্র পাওয়ার পর দীর্ঘদিন কল্যাণপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান তিনি।
এ সময় রাতুল তার পায়ে গুলি লাগার স্থান ট্রাইব্যুনালে দেখান।
রাতুল তার জবানবন্দিতে বলেন, পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, ঘটনার দিন বিজিবির কর্নেল রেদোয়ান, মেজর রাশেদ, রামপুরা থানার ওসি মশিউর রহমান এবং ওই এলাকার পুলিশের এডিসি গুলি চালিয়েছিলেন। তবে পুলিশ ও বিজিবির আরও অনেক সদস্য ঘটনাস্থলে ছিলেন, যাদের তিনি চিনতেন না।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে জানতে পারেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ওবায়দুল কাদের গুলি বর্ষণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
জবানবন্দিতে ১৮ জুলাইয়ের ঘটনাও তুলে ধরেন রাতুল। তিনি বলেন, তার বন্ধু রিফাত গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় হেলিকপ্টার থেকেও গুলি চালানো হয়েছিল। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ১৯ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে আন্দোলনে আরও অনেকের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
রাতুল বলেন, রামপুরার মতো ঘটনা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঘটেছে। তিনি এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি এবং কষ্ট করে চলছেন। যারা গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন এবং যারা গুলি করেছেন, তাদের বিচার চান তিনি।
সাক্ষ্য শেষে কাঠগড়ায় রেদোয়ানুলের কান্না
সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ শেষে মামলার আসামি লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের আর্থিক দুর্দশার কথা তুলে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
জেরা চলাকালে ট্রাইব্যুনালের কাছে কথা বলার অনুমতি নিয়ে রেদোয়ানুল বলেন, ঘনঘন শুনানির তারিখ পড়ায় তার জন্য কষ্ট হচ্ছে। আইনজীবীর নির্ধারিত ফিও দিতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, তার তেমন কোনো সঞ্চয় নেই। বর্তমান বেতন দিয়ে সংসার চালাবেন, নাকি আইনজীবীর খরচ দেবেন—তা নিয়ে তিনি সমস্যায় আছেন। তাই শুনানির তারিখের মধ্যে কিছুটা বেশি সময় দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
এ সময় ট্রাইব্যুনাল তার আইনজীবী শাহীনুর ইসলামের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, রেদোয়ানুলের কাছ থেকে যৌক্তিক ফিই নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, আসামির মূল চাওয়া বিচার পিছিয়ে দেওয়া নয়; বরং মামলার বিচার দ্রুত শেষ করা। অল্প সময়ের ব্যবধানে শুনানি হলে বিচারকাজ দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারক রেদোয়ানুলের বক্তব্য হৃদয় স্পর্শ করেছে বলে মন্তব্য করেন। পরে অসমাপ্ত জেরা শেষ করার জন্য আগামী ২ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় চার আসামির বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেলে রয়েছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম। অপর দুই আসামি মো. রাশেদুল ইসলাম ও মো. মশিউর রহমান পলাতক রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনে রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার সেই দিনের ঘটনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেছেন শিক্ষার্থী রাতুল হাসান। তার অভিযোগ, তৎকালীন রামপুরা এলাকায় দায়িত্বে থাকা বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলামের নেতৃত্বে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল। সেই গুলিতেই তার বাম পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে বলে জবানবন্দিতে জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেন রাতুল হাসান। তিনি এ মামলার ১২ নম্বর সাক্ষী।
সাক্ষ্যগ্রহণের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন মামলার দুই গ্রেপ্তার আসামি বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম। মামলার অপর দুই আসামি পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান পলাতক রয়েছেন।
জবানবন্দিতে তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী রাতুল হাসান বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বন্ধু রিফাত ইসলামসহ কয়েকজনের সঙ্গে রামপুরার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ওই দিন তার বন্ধু রিফাত পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন।
পরদিন ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর রামপুরা মাল্টিকেয়ার হাসপাতালের সামনে আবারও আন্দোলনে যোগ দেন রাতুল। তার ভাষ্য, তখন আন্দোলনকারীদের সামনে বিজিবি ও পুলিশ অবস্থান করছিল। কোনো ধরনের সতর্কবার্তা ছাড়াই তারা গুলি চালানো শুরু করে।
রাতুল বলেন, গুলি শুরু হলে তিনি বেটার লাইফ হাসপাতালের দিকে দৌড় দেন। এ সময় একটি গুলি তার বাম পায়ের হাঁটুর নিচে পেছন দিক দিয়ে ঢুকে সামনের দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। এতে পায়ের হাড় ক্ষতিগ্রস্ত ও ভেঙে যায়।
পরে ভাগ্নে সুলাইমান ও অন্য আন্দোলনকারীদের সহায়তায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা শেষে ২৫ জুলাই ছাড়পত্র পাওয়ার পর দীর্ঘদিন কল্যাণপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান তিনি।
এ সময় রাতুল তার পায়ে গুলি লাগার স্থান ট্রাইব্যুনালে দেখান।
রাতুল তার জবানবন্দিতে বলেন, পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, ঘটনার দিন বিজিবির কর্নেল রেদোয়ান, মেজর রাশেদ, রামপুরা থানার ওসি মশিউর রহমান এবং ওই এলাকার পুলিশের এডিসি গুলি চালিয়েছিলেন। তবে পুলিশ ও বিজিবির আরও অনেক সদস্য ঘটনাস্থলে ছিলেন, যাদের তিনি চিনতেন না।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে জানতে পারেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ওবায়দুল কাদের গুলি বর্ষণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
জবানবন্দিতে ১৮ জুলাইয়ের ঘটনাও তুলে ধরেন রাতুল। তিনি বলেন, তার বন্ধু রিফাত গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় হেলিকপ্টার থেকেও গুলি চালানো হয়েছিল। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ১৯ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে আন্দোলনে আরও অনেকের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
রাতুল বলেন, রামপুরার মতো ঘটনা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঘটেছে। তিনি এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি এবং কষ্ট করে চলছেন। যারা গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন এবং যারা গুলি করেছেন, তাদের বিচার চান তিনি।
সাক্ষ্য শেষে কাঠগড়ায় রেদোয়ানুলের কান্না
সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ শেষে মামলার আসামি লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের আর্থিক দুর্দশার কথা তুলে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
জেরা চলাকালে ট্রাইব্যুনালের কাছে কথা বলার অনুমতি নিয়ে রেদোয়ানুল বলেন, ঘনঘন শুনানির তারিখ পড়ায় তার জন্য কষ্ট হচ্ছে। আইনজীবীর নির্ধারিত ফিও দিতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, তার তেমন কোনো সঞ্চয় নেই। বর্তমান বেতন দিয়ে সংসার চালাবেন, নাকি আইনজীবীর খরচ দেবেন—তা নিয়ে তিনি সমস্যায় আছেন। তাই শুনানির তারিখের মধ্যে কিছুটা বেশি সময় দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
এ সময় ট্রাইব্যুনাল তার আইনজীবী শাহীনুর ইসলামের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, রেদোয়ানুলের কাছ থেকে যৌক্তিক ফিই নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, আসামির মূল চাওয়া বিচার পিছিয়ে দেওয়া নয়; বরং মামলার বিচার দ্রুত শেষ করা। অল্প সময়ের ব্যবধানে শুনানি হলে বিচারকাজ দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারক রেদোয়ানুলের বক্তব্য হৃদয় স্পর্শ করেছে বলে মন্তব্য করেন। পরে অসমাপ্ত জেরা শেষ করার জন্য আগামী ২ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় চার আসামির বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেলে রয়েছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম। অপর দুই আসামি মো. রাশেদুল ইসলাম ও মো. মশিউর রহমান পলাতক রয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন