ঢাকার কণ্ঠ

ইসরায়েল-তুরস্কের দ্বন্দ্বে নতুন ক্ষেত্র সোমালিল্যান্ড

ইসরায়েল-তুরস্কের দ্বন্দ্বে নতুন ক্ষেত্র সোমালিল্যান্ড

আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের সোমালিল্যান্ডকে ঘিরে ইসরায়েল ও তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেতে পারে। অঞ্চলটির কৌশলগত অবস্থান, সোমালিয়া ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সোমালিল্যান্ডের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতার কারণে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও জটিল হয়ে উঠছে।

সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, তুরস্কের সামরিক প্রভাব মোকাবিলায় তারা ইসরায়েলের কাছ থেকে সহায়তা চান। দেশটির প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মোহাম্মদ ওসমান ফাদাল দাবি করেছেন, মোগাদিশুতে তুরস্কের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান রয়েছে এবং সোমালিয়ায় ড্রোন ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা করছে আঙ্কারা। এ কারণে সোমালিল্যান্ড আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ইসরায়েলের সহায়তা চায়।

সোমালিল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদিরাহমান হাসানও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ককে আঞ্চলিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর সোমালিল্যান্ড এখন নতুন অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের দিকে এগিয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনী থাকলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে এবং ইসরায়েলের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশা করছে তারা।

তবে ইয়েমেনের হুতিদের বিষয়ে সোমালিল্যান্ডের অবস্থান ইসরায়েলের তুলনায় আলাদা। দেশটির কর্মকর্তারা সরাসরি সংঘাতে যেতে চান না। মহাপরিচালক হাসান বলেছেন, হুতিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত এবং ইয়েমেনের সংঘাতে জড়াতে চায় না সোমালিল্যান্ড।

সোমালিল্যান্ডের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে এর ভৌগোলিক অবস্থান। এডেন উপসাগরের তীরে অবস্থিত অঞ্চলটি বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছাকাছি। ফলে সেখানে যেকোনো সামরিক বা নিরাপত্তা সহযোগিতা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে সোমালিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক গত দেড় দশকে ব্যাপকভাবে গভীর হয়েছে। তুরস্ক সোমালিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং দেশটির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক খাতেও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা রয়েছে। ২০২৪ সালে সোমালিয়ার নৌবাহিনী গঠন ও প্রশিক্ষণের জন্য দুই দেশ ১০ বছরের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিও করে।

সোমালিয়ার বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সামুদ্রিক সম্পদ নিয়েও তুরস্কের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে সোমালিয়া ও তাদের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তুরস্ক মোগাদিশুর পাশে থাকতে পারে।

এরই মধ্যে ইসরায়েল ও সোমালিল্যান্ডের সম্পর্কও দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা সোমালিয়া ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সমালোচনার মুখে পড়ে। পরে ইসরায়েলি ও সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা আরও এগোয়।

চলতি বছরের জুনে সোমালিল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, ইসরায়েল তাদের পুলিশ ও সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তবে তখন তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের কোনো আলোচনা হয়নি।

সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বেরবেরা বন্দরে আমিরাতের বড় বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের পাশাপাশি সেখানে সামরিক অবকাঠামোর উপস্থিতিও রয়েছে। ফলে ইসরায়েল, তুরস্ক, সোমালিয়া ও উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বার্থ মিলিয়ে হর্ন অব আফ্রিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে।

তবে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে। আঞ্চলিক সংঘাতে কোনো পক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলে সোমালিল্যান্ড নিজেই প্রতিপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এ কারণে অঞ্চলটিতে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি নতুন উত্তেজনার আশঙ্কাও রয়েছে।

বিষয় : সোমালিল্যান্ড ইসরায়েল-তুরস্ক

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
ঢাকার কণ্ঠ

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬


ইসরায়েল-তুরস্কের দ্বন্দ্বে নতুন ক্ষেত্র সোমালিল্যান্ড

প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের সোমালিল্যান্ডকে ঘিরে ইসরায়েল ও তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেতে পারে। অঞ্চলটির কৌশলগত অবস্থান, সোমালিয়া ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সোমালিল্যান্ডের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতার কারণে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও জটিল হয়ে উঠছে।

সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, তুরস্কের সামরিক প্রভাব মোকাবিলায় তারা ইসরায়েলের কাছ থেকে সহায়তা চান। দেশটির প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মোহাম্মদ ওসমান ফাদাল দাবি করেছেন, মোগাদিশুতে তুরস্কের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান রয়েছে এবং সোমালিয়ায় ড্রোন ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা করছে আঙ্কারা। এ কারণে সোমালিল্যান্ড আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ইসরায়েলের সহায়তা চায়।

সোমালিল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদিরাহমান হাসানও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ককে আঞ্চলিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর সোমালিল্যান্ড এখন নতুন অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের দিকে এগিয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনী থাকলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে এবং ইসরায়েলের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশা করছে তারা।

তবে ইয়েমেনের হুতিদের বিষয়ে সোমালিল্যান্ডের অবস্থান ইসরায়েলের তুলনায় আলাদা। দেশটির কর্মকর্তারা সরাসরি সংঘাতে যেতে চান না। মহাপরিচালক হাসান বলেছেন, হুতিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত এবং ইয়েমেনের সংঘাতে জড়াতে চায় না সোমালিল্যান্ড।

সোমালিল্যান্ডের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে এর ভৌগোলিক অবস্থান। এডেন উপসাগরের তীরে অবস্থিত অঞ্চলটি বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছাকাছি। ফলে সেখানে যেকোনো সামরিক বা নিরাপত্তা সহযোগিতা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে সোমালিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক গত দেড় দশকে ব্যাপকভাবে গভীর হয়েছে। তুরস্ক সোমালিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং দেশটির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক খাতেও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা রয়েছে। ২০২৪ সালে সোমালিয়ার নৌবাহিনী গঠন ও প্রশিক্ষণের জন্য দুই দেশ ১০ বছরের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিও করে।

সোমালিয়ার বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সামুদ্রিক সম্পদ নিয়েও তুরস্কের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে সোমালিয়া ও তাদের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তুরস্ক মোগাদিশুর পাশে থাকতে পারে।

এরই মধ্যে ইসরায়েল ও সোমালিল্যান্ডের সম্পর্কও দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা সোমালিয়া ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সমালোচনার মুখে পড়ে। পরে ইসরায়েলি ও সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা আরও এগোয়।

চলতি বছরের জুনে সোমালিল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, ইসরায়েল তাদের পুলিশ ও সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তবে তখন তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের কোনো আলোচনা হয়নি।

সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বেরবেরা বন্দরে আমিরাতের বড় বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের পাশাপাশি সেখানে সামরিক অবকাঠামোর উপস্থিতিও রয়েছে। ফলে ইসরায়েল, তুরস্ক, সোমালিয়া ও উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বার্থ মিলিয়ে হর্ন অব আফ্রিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে।

তবে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে। আঞ্চলিক সংঘাতে কোনো পক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলে সোমালিল্যান্ড নিজেই প্রতিপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এ কারণে অঞ্চলটিতে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি নতুন উত্তেজনার আশঙ্কাও রয়েছে।


ঢাকার কণ্ঠ

সম্পাদক: লিটন মাহমুদ
প্রধান সম্পাদক: মো: আল-আমীন (পনির)
নির্বাহী সম্পাদক: শেখ ফরিদ

কপিরাইট © ২০২৫ ঢাকার কণ্ঠ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত