একটি শহর কতটা আধুনিক, তা শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। একটি শহর তখনই সত্যিকার অর্থে স্মার্ট ও টেকসই হয়ে ওঠে, যখন সেখানে মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব আবাসনের সুযোগ থাকে। বাংলাদেশের নগরায়ণের বাস্তবতায় আবাসন তাই শুধু একটি নাগরিক সুবিধার বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে অন্যতম বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ করে ঢাকার ক্ষেত্রে আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ নতুন হাউজিং ব্যাকলগ তৈরি হচ্ছে। ফলে আবাসন সংকট মোকাবিলায় শুধু ভবন নির্মাণ বাড়ালেই হবে না; পর্যাপ্ত আবাসন সরবরাহের পাশাপাশি সেটিকে কীভাবে স্মার্ট, পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী করা যায়, সেটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নগর উন্নয়নের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপান গত পাঁচ-ছয় দশকে যে অবস্থানে পৌঁছেছে, একইভাবে সিউল ও সিঙ্গাপুরও সীমিত সম্পদ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য থেকে আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরে পরিণত হয়েছে। এসব উদাহরণ আমাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। তবে তাদের মডেল সরাসরি অনুসরণ না করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিজেদের জন্য বাস্তবসম্মত কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
স্মার্ট সিটি ও স্মার্ট আবাসন নিয়ে আমরা বহু বছর ধরে আলোচনা করছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রত্যাশার তুলনায় অগ্রগতি এখনও সীমিত। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি বরং আরও জটিল হয়েছে। তাই এখন শুধু পরিকল্পনা বা নীতির কথা বললে হবে না; বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপের মাধ্যমে আবাসনের সরবরাহ বাড়ানো এবং একই সঙ্গে তার মান উন্নত করার দিকে যেতে হবে।
এ ক্ষেত্রে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে উৎপাদিত মোট এনার্জির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আবাসিক খাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে আবাসিক ভবনগুলোকে যদি আরও স্মার্ট, গ্রিন ও জ্বালানিসাশ্রয়ী করা যায়, তাহলে জাতীয় পর্যায়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এনার্জি সাশ্রয় করা সম্ভব।
স্মার্ট আবাসন বলতে কেবল আধুনিক প্রযুক্তি, সোলার প্যানেল কিংবা নানা ধরনের ডিজিটাল গ্যাজেট ব্যবহারকে বোঝানো উচিত নয়। একটি ভবন এমনভাবে নকশা করা, যাতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে, পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমে এবং ভবনের পুরো জীবনচক্রে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় কম থাকে—এটাই স্মার্ট আবাসনের মূল দর্শন হওয়া উচিত।
এ জন্য শুরু থেকেই প্যাসিভ ডিজাইন কৌশলের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ভবনের সঠিক ওরিয়েন্টেশন, প্রাকৃতিক আলো ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, তাপ নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয় নকশার পর্যায়েই নিশ্চিত করা সম্ভব। রাজউক বা অন্যান্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের এ বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি সোলার এনার্জি, এনার্জি অডিট, কম বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং পানির চাহিদা কমানোর মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। এগুলোর অনেক কিছুই বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ছাড়াই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। প্রয়োজন মূলত সঠিক পরিকল্পনা, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।
তবে একটি ভবনকে শুধু ভবনের ভেতরের বৈশিষ্ট্য দিয়ে স্মার্ট বলা যাবে না। সেটির অবস্থানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আবাসিক ভবন পরিবেশবান্ধব হলেও যদি সেটি কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, চিকিৎসা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা থেকে অনেক দূরে হয়, তাহলে বাসিন্দাদের দীর্ঘ পথ যাতায়াত করতে হবে। এতে পরিবহন ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ।
অতএব, স্মার্ট আবাসনের পরিকল্পনায় পরিবহন ও অবকাঠামোর বিষয়টিও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবা কতটা কাছাকাছি, আবাসিক এলাকা থেকে হেঁটে বা সহজ পরিবহনে প্রয়োজনীয় স্থানে যাওয়া যায় কি না—এসবও একটি টেকসই শহরের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
এখানে আরেকটি বড় বিষয় হলো অর্থায়ন। স্মার্ট সিটি ও টেকসই আবাসন বাস্তবায়নে ফাইন্যান্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৮৯৮ শতাংশের সমপরিমাণ মর্টগেজ ফাইন্যান্স রয়েছে। বিপরীতে চীনে এ হার প্রায় ৩০ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৫০ শতাংশেরও বেশি। এই ব্যবধানই দেখিয়ে দেয়, আবাসন ও নগর উন্নয়নের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, শুধু আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা করলেই হবে না; সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি হাউজিং ফাইন্যান্স, মর্টগেজ ব্যবস্থা এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগও বাড়াতে হবে। আবাসন যদি মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে টেকসই নগরায়ণের লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হবে।
সিউল, জাপান কিংবা সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের বড় শিক্ষা হতে পারে—সঠিক নীতি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বাস্তবসম্মত কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে সীমিত সম্পদ দিয়েও নগর ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। আমাদেরও একইভাবে নিজেদের বাস্তবতার আলোকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কিছু কাঠামো রয়েছে। আমাদের বিএনবিসি গাইডলাইন আছে, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করার জন্য স্রেডার মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আবার এনডিসির আওতায় গ্রিনিং ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর কৌশলও রয়েছে। অর্থাৎ পরিকল্পনা, পরিমাপ ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি একেবারে নেই—এমন নয়।
মূল সমস্যা হচ্ছে বাস্তবায়ন, বড় পরিসরে প্রয়োগ এবং অর্থায়ন। নীতিমালা ও গাইডলাইন থাকলেও সেগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
তাই স্মার্ট ও টেকসই আবাসনের ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত পর্যাপ্ত আবাসন সরবরাহ নিশ্চিত করা। এরপর সেই আবাসনকে জ্বালানিসাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলা। আবাসন, অর্থায়ন, পরিবহন, অবকাঠামো ও পরিবেশ—এই বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
স্মার্ট নগরায়ণ কোনো বিলাসী ধারণা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নগর জীবনের প্রয়োজন। আর সেই ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করতে হলে শুরুতেই আমাদের কৌশলগত ও বাস্তববাদী হতে হবে। পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবায়নের যোগসূত্র এবং আবাসনের সঙ্গে অর্থায়নের সংযোগ যত দ্রুত শক্তিশালী করা যাবে, তত দ্রুতই বাংলাদেশ টেকসই ও বাসযোগ্য নগরায়ণের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
বিষয় : স্মার্ট সিটি

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬
একটি শহর কতটা আধুনিক, তা শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। একটি শহর তখনই সত্যিকার অর্থে স্মার্ট ও টেকসই হয়ে ওঠে, যখন সেখানে মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব আবাসনের সুযোগ থাকে। বাংলাদেশের নগরায়ণের বাস্তবতায় আবাসন তাই শুধু একটি নাগরিক সুবিধার বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে অন্যতম বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ করে ঢাকার ক্ষেত্রে আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ নতুন হাউজিং ব্যাকলগ তৈরি হচ্ছে। ফলে আবাসন সংকট মোকাবিলায় শুধু ভবন নির্মাণ বাড়ালেই হবে না; পর্যাপ্ত আবাসন সরবরাহের পাশাপাশি সেটিকে কীভাবে স্মার্ট, পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী করা যায়, সেটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নগর উন্নয়নের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপান গত পাঁচ-ছয় দশকে যে অবস্থানে পৌঁছেছে, একইভাবে সিউল ও সিঙ্গাপুরও সীমিত সম্পদ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য থেকে আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরে পরিণত হয়েছে। এসব উদাহরণ আমাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। তবে তাদের মডেল সরাসরি অনুসরণ না করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিজেদের জন্য বাস্তবসম্মত কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
স্মার্ট সিটি ও স্মার্ট আবাসন নিয়ে আমরা বহু বছর ধরে আলোচনা করছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রত্যাশার তুলনায় অগ্রগতি এখনও সীমিত। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি বরং আরও জটিল হয়েছে। তাই এখন শুধু পরিকল্পনা বা নীতির কথা বললে হবে না; বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপের মাধ্যমে আবাসনের সরবরাহ বাড়ানো এবং একই সঙ্গে তার মান উন্নত করার দিকে যেতে হবে।
এ ক্ষেত্রে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে উৎপাদিত মোট এনার্জির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আবাসিক খাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে আবাসিক ভবনগুলোকে যদি আরও স্মার্ট, গ্রিন ও জ্বালানিসাশ্রয়ী করা যায়, তাহলে জাতীয় পর্যায়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এনার্জি সাশ্রয় করা সম্ভব।
স্মার্ট আবাসন বলতে কেবল আধুনিক প্রযুক্তি, সোলার প্যানেল কিংবা নানা ধরনের ডিজিটাল গ্যাজেট ব্যবহারকে বোঝানো উচিত নয়। একটি ভবন এমনভাবে নকশা করা, যাতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে, পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমে এবং ভবনের পুরো জীবনচক্রে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় কম থাকে—এটাই স্মার্ট আবাসনের মূল দর্শন হওয়া উচিত।
এ জন্য শুরু থেকেই প্যাসিভ ডিজাইন কৌশলের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ভবনের সঠিক ওরিয়েন্টেশন, প্রাকৃতিক আলো ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, তাপ নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয় নকশার পর্যায়েই নিশ্চিত করা সম্ভব। রাজউক বা অন্যান্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের এ বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি সোলার এনার্জি, এনার্জি অডিট, কম বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং পানির চাহিদা কমানোর মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। এগুলোর অনেক কিছুই বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ছাড়াই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। প্রয়োজন মূলত সঠিক পরিকল্পনা, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।
তবে একটি ভবনকে শুধু ভবনের ভেতরের বৈশিষ্ট্য দিয়ে স্মার্ট বলা যাবে না। সেটির অবস্থানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আবাসিক ভবন পরিবেশবান্ধব হলেও যদি সেটি কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, চিকিৎসা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা থেকে অনেক দূরে হয়, তাহলে বাসিন্দাদের দীর্ঘ পথ যাতায়াত করতে হবে। এতে পরিবহন ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ।
অতএব, স্মার্ট আবাসনের পরিকল্পনায় পরিবহন ও অবকাঠামোর বিষয়টিও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবা কতটা কাছাকাছি, আবাসিক এলাকা থেকে হেঁটে বা সহজ পরিবহনে প্রয়োজনীয় স্থানে যাওয়া যায় কি না—এসবও একটি টেকসই শহরের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
এখানে আরেকটি বড় বিষয় হলো অর্থায়ন। স্মার্ট সিটি ও টেকসই আবাসন বাস্তবায়নে ফাইন্যান্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৮৯৮ শতাংশের সমপরিমাণ মর্টগেজ ফাইন্যান্স রয়েছে। বিপরীতে চীনে এ হার প্রায় ৩০ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৫০ শতাংশেরও বেশি। এই ব্যবধানই দেখিয়ে দেয়, আবাসন ও নগর উন্নয়নের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, শুধু আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা করলেই হবে না; সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি হাউজিং ফাইন্যান্স, মর্টগেজ ব্যবস্থা এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগও বাড়াতে হবে। আবাসন যদি মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে টেকসই নগরায়ণের লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হবে।
সিউল, জাপান কিংবা সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের বড় শিক্ষা হতে পারে—সঠিক নীতি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বাস্তবসম্মত কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে সীমিত সম্পদ দিয়েও নগর ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। আমাদেরও একইভাবে নিজেদের বাস্তবতার আলোকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কিছু কাঠামো রয়েছে। আমাদের বিএনবিসি গাইডলাইন আছে, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করার জন্য স্রেডার মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আবার এনডিসির আওতায় গ্রিনিং ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর কৌশলও রয়েছে। অর্থাৎ পরিকল্পনা, পরিমাপ ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি একেবারে নেই—এমন নয়।
মূল সমস্যা হচ্ছে বাস্তবায়ন, বড় পরিসরে প্রয়োগ এবং অর্থায়ন। নীতিমালা ও গাইডলাইন থাকলেও সেগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
তাই স্মার্ট ও টেকসই আবাসনের ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত পর্যাপ্ত আবাসন সরবরাহ নিশ্চিত করা। এরপর সেই আবাসনকে জ্বালানিসাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলা। আবাসন, অর্থায়ন, পরিবহন, অবকাঠামো ও পরিবেশ—এই বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
স্মার্ট নগরায়ণ কোনো বিলাসী ধারণা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নগর জীবনের প্রয়োজন। আর সেই ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করতে হলে শুরুতেই আমাদের কৌশলগত ও বাস্তববাদী হতে হবে। পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবায়নের যোগসূত্র এবং আবাসনের সঙ্গে অর্থায়নের সংযোগ যত দ্রুত শক্তিশালী করা যাবে, তত দ্রুতই বাংলাদেশ টেকসই ও বাসযোগ্য নগরায়ণের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

আপনার মতামত লিখুন