বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বাইনান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছে বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, এটি ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা হতে পারে। এ ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইনঅ্যানালাইসিসের দাবি, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা এ হামলা চালিয়েছে। টিআরএম ল্যাবসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, হামলাকারীরা ১০টি ব্লকচেইনে থাকা বাইনান্সের ওয়ালেট লক্ষ্য করে অর্থ সরিয়ে নেয়। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে চুরি হওয়া অর্থের বড় অংশ অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়।
বাইনান্স জানিয়েছে, অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় চুরি হওয়া সম্পদের মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। বাকি প্রায় ৩৩০ কোটি ডলারের কী অবস্থা, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিস্তারিত জানায়নি। তবে বাইনান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হে বলেছেন, হ্যাকিংয়ের কারণে হওয়া সব ক্ষতির দায় প্রতিষ্ঠানটি নেবে।
বাইনান্স আরও জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের জমা রাখা অর্থে কোনো প্রভাব পড়েনি। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অর্থ উত্তোলনের সেবা আবার চালু করার প্রত্যাশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
টিআরএম ল্যাবসের মতে, হামলার ধরন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আগের কয়েকটি সাইবার চুরির ঘটনার সঙ্গে মিলে যায়। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইবিটে চালানো হামলার কথাও উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ওই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। এ ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে উচ্চমাত্রার আস্থা রয়েছে বলে জানিয়েছে টিআরএম ল্যাবস। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে জেনেভায় উত্তর কোরিয়ার মিশন ও চীনে দেশটির দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসসহ খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাইনান্সে এ হামলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো চুরির ঘটনা হতে পারে। ক্রিপ্টো বাজারের বড় লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান জিএসআরের কর্মকর্তা অরবিন্দ শ্রীনিবাসন একে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাকিং হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
হামলার পর দরপতন ক্রিপ্টো বাজারে
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার এশিয়ার বাজারে ক্রিপ্টোকারেন্সির দামে বড় পতন দেখা যায়। বিটকয়েনের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে নেমে আসে। ইথারের দামও ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে দাঁড়ায়।
বাইনান্সের লেনদেন ফি পরিশোধে ব্যবহার করা যায় এমন ক্রিপ্টো টোকেন বিএনবির দামও গত ২৪ ঘণ্টায় ৫ শতাংশ কমে ৭০৯ দশমিক ৭০ ডলারে নেমে আসে। বাজার বিশ্লেষণকারী প্ল্যাটফর্ম কয়েনগেকোর তথ্য অনুযায়ী, এ দরপতন হয়েছে হামলার খবরের পর।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে লেনদেন-পরবর্তী সময়ে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস গ্লোবালের শেয়ারের দাম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। বিটকয়েনে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজির শেয়ারের দামও প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে।
প্রকৌশলীর ল্যাপটপ থেকে হামলার সূত্রপাতের সন্দেহ
বাইনান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির এক প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে হামলার সূত্রপাত হতে পারে। ওই কম্পিউটারে প্রবেশাধিকার পেয়ে হামলাকারীরা বাইনান্সের একটি সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশ করে অর্থ সরিয়ে নেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাইনান্স জানিয়েছে, একাধিক কারণে এ ঘটনা ঘটতে পারে। আপাতত নিরাপত্তা দল হ্যাক হওয়া কম্পিউটারকে সম্ভাব্য প্রবেশপথ হিসেবে ধরে পুরো হামলার সূত্র খুঁজে দেখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা শুধু চুরি হওয়া অর্থের ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধি এবং এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কমে যাওয়ায় আগে থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে এ বাজার।
হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হ্যাশকি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ গবেষক টিম সান বলেন, এ ঘটনা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ আরও কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে রাখা সম্পদের নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বাইনান্সের বিশ্বজুড়ে নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৩ কোটি ৫০ লাখ। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের হেফাজতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ হাজার ২৮০ কোটি ডলার। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে।
সম্পদ সুরক্ষায় জব্দ কার্যক্রম
বাইনান্সের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাজনিত হামলার ঘটনায় ব্যবহারকারীদের সম্পদ সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির একটি বিশেষ তহবিল রয়েছে। ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজারস’ বা সাফু নামে পরিচিত এই তহবিলের অর্থ সম্পূর্ণ বিটকয়েনে সংরক্ষিত রাখা হয়।
ট্রেস ফাইন্যান্সের প্রধান নির্বাহী বার্নার্ডো ব্রিটেস বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে হ্যাকাররা আগের চেয়ে দ্রুত নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারছে। ফলে সেগুলো ঠিক করার আগেই হামলা ঠেকানো কঠিন হয়ে উঠছে। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনায় ব্যবহারকারীরা ছোট ও মাঝারি আকারের এক্সচেঞ্জ থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে পারেন।
এ ঘটনায় বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও চুরি হওয়া সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার জানিয়েছে, হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ তারা জব্দ করেছে। আরেক প্রতিষ্ঠান সার্কেল জব্দ করেছে ৮০ কোটির বেশি ডলারের সম্পদ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল জানিয়েছে, তারা ক্রিপ্টো সম্পদ সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান বিটগোর সঙ্গে কাজ করে চুরি হওয়া অর্থ জব্দে সহযোগিতা করেছে। বাইনান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হের তথ্য অনুযায়ী, ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের স্টেবলকয়েন এবং ওয়ার্ল্ড লিবার্টির প্রায় ২০ লাখ ডলারের টোকেন জব্দ করা হয়েছে।
ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান রিপলও প্রায় ২০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে বলে জানিয়েছেন ই হে। রিপলের স্টেবলকয়েন বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট জ্যাক ম্যাকডোনাল্ড বলেন, বাইনান্সে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ত্রুটির খবর তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।
ক্রিপ্টো খাতে ধারাবাহিক চুরির ঘটনা
ব্লকচেইন গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান আর্কহ্যামের প্রধান নির্বাহী মিগুয়েল মোরেল বলেন, তাদের কাছে থাকা তথ্য বিশ্লেষণে বাইনান্স থেকে অজ্ঞাতপরিচয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে কয়েক শ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ক্রিপ্টো খাতে একের পর এক চুরির ঘটনার মধ্যে নতুন করে এ হামলার খবর এল। টিআরএম ল্যাবসের গবেষকদের হিসাবে, গত বছর প্রায় ১৫০টি পৃথক হামলায় ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বরে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিটগেটও জানিয়েছিল, তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছে।
প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ স্থানান্তরে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে বলেও সতর্ক করেছে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ।
বাইনান্সের আলাদা প্রতিষ্ঠান বাইনান্স ইউএস জানিয়েছে, এ নিরাপত্তা ঘটনার প্রভাব তাদের ওপর পড়েনি। ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেসও বলেছে, তারা আক্রান্ত হয়নি এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
এদিকে পৃথক আরেক ঘটনায় বৃহস্পতিবার তৃতীয় পক্ষের সেবাদাতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সমস্যার কারণে কিছু সময়ের জন্য লেনদেন বন্ধ রাখে প্রেডিকশন মার্কেট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পলিমার্কেট। পরে লেনদেন আবার চালু করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের অর্থ পুরোপুরি ফেরত দেওয়া হবে।
সূত্র: রয়টার্স
বিষয় : ক্রিপ্টো কারেন্সি বাইন্যান্স

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বাইনান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছে বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, এটি ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা হতে পারে। এ ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইনঅ্যানালাইসিসের দাবি, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা এ হামলা চালিয়েছে। টিআরএম ল্যাবসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, হামলাকারীরা ১০টি ব্লকচেইনে থাকা বাইনান্সের ওয়ালেট লক্ষ্য করে অর্থ সরিয়ে নেয়। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে চুরি হওয়া অর্থের বড় অংশ অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়।
বাইনান্স জানিয়েছে, অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় চুরি হওয়া সম্পদের মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। বাকি প্রায় ৩৩০ কোটি ডলারের কী অবস্থা, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিস্তারিত জানায়নি। তবে বাইনান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হে বলেছেন, হ্যাকিংয়ের কারণে হওয়া সব ক্ষতির দায় প্রতিষ্ঠানটি নেবে।
বাইনান্স আরও জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের জমা রাখা অর্থে কোনো প্রভাব পড়েনি। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অর্থ উত্তোলনের সেবা আবার চালু করার প্রত্যাশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
টিআরএম ল্যাবসের মতে, হামলার ধরন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আগের কয়েকটি সাইবার চুরির ঘটনার সঙ্গে মিলে যায়। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইবিটে চালানো হামলার কথাও উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ওই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। এ ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে উচ্চমাত্রার আস্থা রয়েছে বলে জানিয়েছে টিআরএম ল্যাবস। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে জেনেভায় উত্তর কোরিয়ার মিশন ও চীনে দেশটির দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসসহ খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাইনান্সে এ হামলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো চুরির ঘটনা হতে পারে। ক্রিপ্টো বাজারের বড় লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান জিএসআরের কর্মকর্তা অরবিন্দ শ্রীনিবাসন একে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাকিং হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
হামলার পর দরপতন ক্রিপ্টো বাজারে
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার এশিয়ার বাজারে ক্রিপ্টোকারেন্সির দামে বড় পতন দেখা যায়। বিটকয়েনের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে নেমে আসে। ইথারের দামও ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে দাঁড়ায়।
বাইনান্সের লেনদেন ফি পরিশোধে ব্যবহার করা যায় এমন ক্রিপ্টো টোকেন বিএনবির দামও গত ২৪ ঘণ্টায় ৫ শতাংশ কমে ৭০৯ দশমিক ৭০ ডলারে নেমে আসে। বাজার বিশ্লেষণকারী প্ল্যাটফর্ম কয়েনগেকোর তথ্য অনুযায়ী, এ দরপতন হয়েছে হামলার খবরের পর।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে লেনদেন-পরবর্তী সময়ে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস গ্লোবালের শেয়ারের দাম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। বিটকয়েনে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজির শেয়ারের দামও প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে।
প্রকৌশলীর ল্যাপটপ থেকে হামলার সূত্রপাতের সন্দেহ
বাইনান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির এক প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে হামলার সূত্রপাত হতে পারে। ওই কম্পিউটারে প্রবেশাধিকার পেয়ে হামলাকারীরা বাইনান্সের একটি সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশ করে অর্থ সরিয়ে নেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাইনান্স জানিয়েছে, একাধিক কারণে এ ঘটনা ঘটতে পারে। আপাতত নিরাপত্তা দল হ্যাক হওয়া কম্পিউটারকে সম্ভাব্য প্রবেশপথ হিসেবে ধরে পুরো হামলার সূত্র খুঁজে দেখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা শুধু চুরি হওয়া অর্থের ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধি এবং এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কমে যাওয়ায় আগে থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে এ বাজার।
হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হ্যাশকি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ গবেষক টিম সান বলেন, এ ঘটনা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ আরও কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে রাখা সম্পদের নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বাইনান্সের বিশ্বজুড়ে নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৩ কোটি ৫০ লাখ। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের হেফাজতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ হাজার ২৮০ কোটি ডলার। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে।
সম্পদ সুরক্ষায় জব্দ কার্যক্রম
বাইনান্সের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাজনিত হামলার ঘটনায় ব্যবহারকারীদের সম্পদ সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির একটি বিশেষ তহবিল রয়েছে। ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজারস’ বা সাফু নামে পরিচিত এই তহবিলের অর্থ সম্পূর্ণ বিটকয়েনে সংরক্ষিত রাখা হয়।
ট্রেস ফাইন্যান্সের প্রধান নির্বাহী বার্নার্ডো ব্রিটেস বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে হ্যাকাররা আগের চেয়ে দ্রুত নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারছে। ফলে সেগুলো ঠিক করার আগেই হামলা ঠেকানো কঠিন হয়ে উঠছে। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনায় ব্যবহারকারীরা ছোট ও মাঝারি আকারের এক্সচেঞ্জ থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে পারেন।
এ ঘটনায় বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও চুরি হওয়া সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার জানিয়েছে, হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ তারা জব্দ করেছে। আরেক প্রতিষ্ঠান সার্কেল জব্দ করেছে ৮০ কোটির বেশি ডলারের সম্পদ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল জানিয়েছে, তারা ক্রিপ্টো সম্পদ সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান বিটগোর সঙ্গে কাজ করে চুরি হওয়া অর্থ জব্দে সহযোগিতা করেছে। বাইনান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হের তথ্য অনুযায়ী, ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের স্টেবলকয়েন এবং ওয়ার্ল্ড লিবার্টির প্রায় ২০ লাখ ডলারের টোকেন জব্দ করা হয়েছে।
ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান রিপলও প্রায় ২০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে বলে জানিয়েছেন ই হে। রিপলের স্টেবলকয়েন বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট জ্যাক ম্যাকডোনাল্ড বলেন, বাইনান্সে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ত্রুটির খবর তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।
ক্রিপ্টো খাতে ধারাবাহিক চুরির ঘটনা
ব্লকচেইন গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান আর্কহ্যামের প্রধান নির্বাহী মিগুয়েল মোরেল বলেন, তাদের কাছে থাকা তথ্য বিশ্লেষণে বাইনান্স থেকে অজ্ঞাতপরিচয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে কয়েক শ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ক্রিপ্টো খাতে একের পর এক চুরির ঘটনার মধ্যে নতুন করে এ হামলার খবর এল। টিআরএম ল্যাবসের গবেষকদের হিসাবে, গত বছর প্রায় ১৫০টি পৃথক হামলায় ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বরে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিটগেটও জানিয়েছিল, তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছে।
প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ স্থানান্তরে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে বলেও সতর্ক করেছে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ।
বাইনান্সের আলাদা প্রতিষ্ঠান বাইনান্স ইউএস জানিয়েছে, এ নিরাপত্তা ঘটনার প্রভাব তাদের ওপর পড়েনি। ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেসও বলেছে, তারা আক্রান্ত হয়নি এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
এদিকে পৃথক আরেক ঘটনায় বৃহস্পতিবার তৃতীয় পক্ষের সেবাদাতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সমস্যার কারণে কিছু সময়ের জন্য লেনদেন বন্ধ রাখে প্রেডিকশন মার্কেট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পলিমার্কেট। পরে লেনদেন আবার চালু করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের অর্থ পুরোপুরি ফেরত দেওয়া হবে।
সূত্র: রয়টার্স

আপনার মতামত লিখুন