ঢাকার কণ্ঠ
প্রকাশ : সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬। ০৩:৫৩ মিনিট

চট্টগ্রামে পানি নামলেও বাড়ছে দুর্ভোগ, পাঁচ দিনে ১৩ জনের মৃত্যু

চট্টগ্রামে পানি নামলেও বাড়ছে দুর্ভোগ, পাঁচ দিনে ১৩ জনের মৃত্যু
ছবিঃ সংগ্রহীত

চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকায় ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বন্যার ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। টানা কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর হাজারো মানুষ এখনো চরম দুর্ভোগে রয়েছেন।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ দিনে বন্যা, পাহাড় ও দেয়ালধসের ঘটনায় ৬ শিশুসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সাতকানিয়ায় রোববার থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করায় সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ ধীরে ধীরে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরছেন। তবে ঘরে ফিরেও স্বস্তি নেই। কাদায় ভরে গেছে ঘরবাড়ি, নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র ও খাদ্যসামগ্রী। বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সংকটে রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। পানি কমতে শুরু করায় তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন বাড়ি ফিরে গেছেন।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ডলু নদীসংলগ্ন নিচু এলাকা এখনো পানির নিচে থাকায় অনেক পরিবার ফিরতে পারেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।

অন্যদিকে বাঁশখালীতে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। নতুন করে বৃষ্টিপাত হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় পানির উচ্চতা আরও বেড়েছে। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখনো প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক এখনো পানির নিচে। অনেক এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাচল সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্গম এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি। শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে রয়েছেন অনেক পরিবার।

বাঁশখালীর ইউএনও মো. রুহুল আমিন বলেন, নতুন বৃষ্টির কারণে কয়েকটি এলাকায় পানি আরও বেড়েছে। বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হতো। প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

বন্যার কারণে কৃষি ও মৎস্য খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির নিচে নষ্ট হয়েছে ধান, সবজি, পানের বরজসহ বিভিন্ন ফসল।

এ ছাড়া প্রায় ১০ হাজার বাণিজ্যিক মাছের ঘের ও চিংড়ি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, শুধু মৎস্য খাতেই প্রায় ৩৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

বন্যা-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে ডায়রিয়া, আমাশয় ও অন্যান্য জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, সাতকানিয়ার ২৪টি এবং বাঁশখালীর ১৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা ও অতিবৃষ্টিজনিত ঘটনায় আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯০ জন। তাদের মধ্যে ৭৫ জন সাপে কাটা রোগী। তবে এখন পর্যন্ত সাপে কাটা কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৪২ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সোমবার বিকেল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে বৃষ্টির তীব্রতা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিভাগীয় প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলমান বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগে ৮ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত বিভাগজুড়ে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং দুর্গত মানুষের জন্য ১ হাজার ৭০০টির বেশি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

পানি কমতে শুরু করলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, অবকাঠামো মেরামত, কৃষি ও মৎস্য খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিষয় : চট্টগ্রামে বন্যার তাণ্ডব

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
ঢাকার কণ্ঠ

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


চট্টগ্রামে পানি নামলেও বাড়ছে দুর্ভোগ, পাঁচ দিনে ১৩ জনের মৃত্যু

প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬

featured Image

চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকায় ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বন্যার ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। টানা কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর হাজারো মানুষ এখনো চরম দুর্ভোগে রয়েছেন।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ দিনে বন্যা, পাহাড় ও দেয়ালধসের ঘটনায় ৬ শিশুসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সাতকানিয়ায় রোববার থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করায় সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ ধীরে ধীরে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরছেন। তবে ঘরে ফিরেও স্বস্তি নেই। কাদায় ভরে গেছে ঘরবাড়ি, নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র ও খাদ্যসামগ্রী। বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সংকটে রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। পানি কমতে শুরু করায় তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন বাড়ি ফিরে গেছেন।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ডলু নদীসংলগ্ন নিচু এলাকা এখনো পানির নিচে থাকায় অনেক পরিবার ফিরতে পারেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।

অন্যদিকে বাঁশখালীতে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। নতুন করে বৃষ্টিপাত হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় পানির উচ্চতা আরও বেড়েছে। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখনো প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক এখনো পানির নিচে। অনেক এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাচল সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্গম এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি। শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে রয়েছেন অনেক পরিবার।

বাঁশখালীর ইউএনও মো. রুহুল আমিন বলেন, নতুন বৃষ্টির কারণে কয়েকটি এলাকায় পানি আরও বেড়েছে। বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হতো। প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

বন্যার কারণে কৃষি ও মৎস্য খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির নিচে নষ্ট হয়েছে ধান, সবজি, পানের বরজসহ বিভিন্ন ফসল।

এ ছাড়া প্রায় ১০ হাজার বাণিজ্যিক মাছের ঘের ও চিংড়ি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, শুধু মৎস্য খাতেই প্রায় ৩৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

বন্যা-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে ডায়রিয়া, আমাশয় ও অন্যান্য জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, সাতকানিয়ার ২৪টি এবং বাঁশখালীর ১৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা ও অতিবৃষ্টিজনিত ঘটনায় আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯০ জন। তাদের মধ্যে ৭৫ জন সাপে কাটা রোগী। তবে এখন পর্যন্ত সাপে কাটা কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৪২ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সোমবার বিকেল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে বৃষ্টির তীব্রতা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিভাগীয় প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলমান বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগে ৮ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত বিভাগজুড়ে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং দুর্গত মানুষের জন্য ১ হাজার ৭০০টির বেশি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

পানি কমতে শুরু করলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, অবকাঠামো মেরামত, কৃষি ও মৎস্য খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


ঢাকার কণ্ঠ

সম্পাদক: লিটন মাহমুদ
প্রধান সম্পাদক: মো: আল-আমীন (পনির)
নির্বাহী সম্পাদক: শেখ ফরিদ

কপিরাইট © ২০২৫ ঢাকার কণ্ঠ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত