চার বছরের যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সৌদি আরব লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদার এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানও জটিল কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সোমবার হুথিরা সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তাদের দাবি, সৌদি বাহিনী হুথি-নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে হামলা চালানোর জবাব হিসেবেই এই হামলা করা হয়েছে। এর ফলে চার বছরের যুদ্ধবিরতির পর আবারও সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে পাকিস্তান। ওই চুক্তির আওতায় বর্তমানে সৌদি আরবে হাজারো পাকিস্তানি সেনা এবং একটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন মোতায়েন রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘সৌদি আরবের ওপর হামলা মানেই পাকিস্তানের ওপর হামলা। এটি আমাদের স্পষ্ট রেড লাইন।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, ইসলামাবাদ এত দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি হবে বলে ধারণা করেনি। হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে ইয়েমেন সীমান্তের কাছে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনারা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগরে উত্তেজনা আরও বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে। এতে পাকিস্তানের জ্বালানি আমদানিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ দেশটির বড় অংশের জ্বালানি এই নৌপথেই আসে।
অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল গুলাম মুস্তাফা বলেন, আপাতত পাকিস্তান সব পক্ষকে সংযত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুথিরা যদি সৌদি আরবের আরও গভীরে হামলা চালায়, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে।
এদিকে পাকিস্তান ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দেশটির কর্মকর্তাদের দাবি, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের অবস্থানের সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর অবস্থানের পার্থক্য বাড়ছে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফরও কয়েকদিন পিছিয়ে যায়। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি পাকিস্তান সফর করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, ইসলামাবাদ সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তার ভাষায়, ‘টেকসই সম্পৃক্ততা, সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।’
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে দায়িত্ব, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়াতেও ইসলামাবাদ প্রস্তুত।
বিষয় : পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যে

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬
চার বছরের যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সৌদি আরব লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদার এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানও জটিল কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সোমবার হুথিরা সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তাদের দাবি, সৌদি বাহিনী হুথি-নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে হামলা চালানোর জবাব হিসেবেই এই হামলা করা হয়েছে। এর ফলে চার বছরের যুদ্ধবিরতির পর আবারও সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে পাকিস্তান। ওই চুক্তির আওতায় বর্তমানে সৌদি আরবে হাজারো পাকিস্তানি সেনা এবং একটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন মোতায়েন রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘সৌদি আরবের ওপর হামলা মানেই পাকিস্তানের ওপর হামলা। এটি আমাদের স্পষ্ট রেড লাইন।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, ইসলামাবাদ এত দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি হবে বলে ধারণা করেনি। হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে ইয়েমেন সীমান্তের কাছে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনারা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগরে উত্তেজনা আরও বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে। এতে পাকিস্তানের জ্বালানি আমদানিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ দেশটির বড় অংশের জ্বালানি এই নৌপথেই আসে।
অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল গুলাম মুস্তাফা বলেন, আপাতত পাকিস্তান সব পক্ষকে সংযত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুথিরা যদি সৌদি আরবের আরও গভীরে হামলা চালায়, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে।
এদিকে পাকিস্তান ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দেশটির কর্মকর্তাদের দাবি, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের অবস্থানের সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর অবস্থানের পার্থক্য বাড়ছে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফরও কয়েকদিন পিছিয়ে যায়। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি পাকিস্তান সফর করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, ইসলামাবাদ সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তার ভাষায়, ‘টেকসই সম্পৃক্ততা, সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।’
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে দায়িত্ব, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়াতেও ইসলামাবাদ প্রস্তুত।

আপনার মতামত লিখুন