ঢাকার কণ্ঠ
প্রকাশ : সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬। ০৪:৪৩ মিনিট

কাশ্মীরে সহিংসতায় ৯০ জনের মৃত্যু, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

কাশ্মীরে সহিংসতায় ৯০ জনের মৃত্যু, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে বিক্ষোভ ও নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় গত ৫ জুন থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত ৯০ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে যুক্তরাজ্য-নিবন্ধিত মানবাধিকার সংগঠন জম্মু কাশ্মীর হিউম্যান রাইটস অবজারভেটরি (জেকেএইচআরও)। নিহতদের অনেকের পরিবার এখনো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে বেআইনি আটক, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগও সামনে এসেছে।

সংগঠনটির ৪৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ৫ জুন থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত নিহত ৯০ জনের নাম ও ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমে বিদ্যুতের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হলেও পরে তা অঞ্চলটির রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।

প্রতিবেদনে ২৬ বছর বয়সী ফাহাদ বারকাতের মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ জুন রাতে রাওয়ালাকোটের একটি সামরিক হাসপাতালে রক্ত দিতে গিয়েছিলেন তিনি। রাত ১১টা ৩১ মিনিটে বোনকে শেষ বার্তা পাঠানোর পর নিখোঁজ হন ফাহাদ। তাঁর পরিবার দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ধারণা করেছিল, তিনি পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। পরে সংবাদমাধ্যমে নিহত বেসামরিক ব্যক্তিদের তালিকায় তাঁর নাম প্রকাশিত হয়।

ফাহাদের পরিবারের অভিযোগ, তাঁর মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়। মানবাধিকার সংগঠনটি এ ঘটনায় হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ, রক্তদানের নথি, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও দাফনসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। তবে তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তি বা পক্ষকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)। সংগঠনটি স্থানীয় নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানায় এবং আঞ্চলিক আইনসভায় ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানের অন্য এলাকায় বসবাসরত শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিলের দাবি তোলে। তাদের বক্তব্য, বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো স্থানীয় বাসিন্দাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করছে না।

অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকার সংরক্ষিত আসনগুলো বাতিলের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। সরকার বলেছে, আসনগুলো সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত এবং কাশ্মীরের মর্যাদা নিয়ে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে জেএএসিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ করা হয় এবং সংগঠনটির কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বেআইনি আটক ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ওঠে। তবে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, সহিংসতায় সশস্ত্র ব্যক্তিরাও জড়িত ছিলেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনার স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে।

প্রতিবেদনে শওকত নওয়াজ মীরের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, ৩০ জুন ধিরকোট থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাঁর অবস্থান, আটকের আইনি ভিত্তি কিংবা কোথায় রাখা হয়েছে, তা জানানো হয়নি। পরে তাঁর বোন ইয়ামিন মীর আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর হাইকোর্টে আবেদন করে তাঁকে আদালতে হাজির করার দাবি জানান।

আরেক ঘটনায়, জাবির মুমতাজ নামে এক ব্যক্তির পরিবার অভিযোগ করেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তাঁর মৃত্যুর আগে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। মরদেহ হস্তান্তর ও দাফন নিয়ে পরিবারের অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনটি। 

সহিংসতার সময় অঞ্চলটিতে ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগ বন্ধ রাখার কারণে তথ্য সংগ্রহ ও স্বাধীনভাবে ঘটনা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরায় চালু করা, সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগের অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। 

পাকিস্তান মানবাধিকার কমিশনের (এইচআরসিপি) একটি অনুসন্ধানী দলও আগস্টে অঞ্চলটির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সব মৃত্যুর ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, আটক ব্যক্তিদের আইনি অধিকার নিশ্চিত এবং রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। 

জেকেএইচআরও বলেছে, প্রতিবেদনে নথিভুক্ত প্রতিটি মৃত্যুর কারণ বা দায়ী পক্ষ একই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। প্রতিটি ঘটনার আলাদা তদন্ত করে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ, আটক ব্যক্তিদের অবস্থান প্রকাশ এবং পরিবারের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দেওয়া জরুরি। নিহতদের স্বজনদের অভিযোগের বিষয়ে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের সরকার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পুলিশের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়েছে বলে দ্য ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে।

বিষয় : কাশ্মীর গুরুতর অভিযোগ বিক্ষোভ

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
ঢাকার কণ্ঠ

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬


কাশ্মীরে সহিংসতায় ৯০ জনের মৃত্যু, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে বিক্ষোভ ও নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় গত ৫ জুন থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত ৯০ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে যুক্তরাজ্য-নিবন্ধিত মানবাধিকার সংগঠন জম্মু কাশ্মীর হিউম্যান রাইটস অবজারভেটরি (জেকেএইচআরও)। নিহতদের অনেকের পরিবার এখনো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে বেআইনি আটক, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগও সামনে এসেছে।

সংগঠনটির ৪৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ৫ জুন থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত নিহত ৯০ জনের নাম ও ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমে বিদ্যুতের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হলেও পরে তা অঞ্চলটির রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।

প্রতিবেদনে ২৬ বছর বয়সী ফাহাদ বারকাতের মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ জুন রাতে রাওয়ালাকোটের একটি সামরিক হাসপাতালে রক্ত দিতে গিয়েছিলেন তিনি। রাত ১১টা ৩১ মিনিটে বোনকে শেষ বার্তা পাঠানোর পর নিখোঁজ হন ফাহাদ। তাঁর পরিবার দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ধারণা করেছিল, তিনি পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। পরে সংবাদমাধ্যমে নিহত বেসামরিক ব্যক্তিদের তালিকায় তাঁর নাম প্রকাশিত হয়।

ফাহাদের পরিবারের অভিযোগ, তাঁর মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়। মানবাধিকার সংগঠনটি এ ঘটনায় হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ, রক্তদানের নথি, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও দাফনসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। তবে তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তি বা পক্ষকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)। সংগঠনটি স্থানীয় নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানায় এবং আঞ্চলিক আইনসভায় ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানের অন্য এলাকায় বসবাসরত শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিলের দাবি তোলে। তাদের বক্তব্য, বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো স্থানীয় বাসিন্দাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করছে না।

অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকার সংরক্ষিত আসনগুলো বাতিলের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। সরকার বলেছে, আসনগুলো সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত এবং কাশ্মীরের মর্যাদা নিয়ে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে জেএএসিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ করা হয় এবং সংগঠনটির কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বেআইনি আটক ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ওঠে। তবে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, সহিংসতায় সশস্ত্র ব্যক্তিরাও জড়িত ছিলেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনার স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে।

প্রতিবেদনে শওকত নওয়াজ মীরের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, ৩০ জুন ধিরকোট থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাঁর অবস্থান, আটকের আইনি ভিত্তি কিংবা কোথায় রাখা হয়েছে, তা জানানো হয়নি। পরে তাঁর বোন ইয়ামিন মীর আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর হাইকোর্টে আবেদন করে তাঁকে আদালতে হাজির করার দাবি জানান।

আরেক ঘটনায়, জাবির মুমতাজ নামে এক ব্যক্তির পরিবার অভিযোগ করেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তাঁর মৃত্যুর আগে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। মরদেহ হস্তান্তর ও দাফন নিয়ে পরিবারের অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনটি। 

সহিংসতার সময় অঞ্চলটিতে ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগ বন্ধ রাখার কারণে তথ্য সংগ্রহ ও স্বাধীনভাবে ঘটনা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরায় চালু করা, সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগের অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। 

পাকিস্তান মানবাধিকার কমিশনের (এইচআরসিপি) একটি অনুসন্ধানী দলও আগস্টে অঞ্চলটির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সব মৃত্যুর ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, আটক ব্যক্তিদের আইনি অধিকার নিশ্চিত এবং রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। 

জেকেএইচআরও বলেছে, প্রতিবেদনে নথিভুক্ত প্রতিটি মৃত্যুর কারণ বা দায়ী পক্ষ একই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। প্রতিটি ঘটনার আলাদা তদন্ত করে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ, আটক ব্যক্তিদের অবস্থান প্রকাশ এবং পরিবারের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দেওয়া জরুরি। নিহতদের স্বজনদের অভিযোগের বিষয়ে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের সরকার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পুলিশের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়েছে বলে দ্য ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে।


ঢাকার কণ্ঠ

সম্পাদক: লিটন মাহমুদ
প্রধান সম্পাদক: মো: আল-আমীন (পনির)
নির্বাহী সম্পাদক: শেখ ফরিদ

কপিরাইট © ২০২৫ ঢাকার কণ্ঠ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত