সম্পর্ক ভেঙে গেছে, যোগাযোগও বন্ধ। তবু হঠাৎ ফোন হাতে নিয়ে প্রাক্তনের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল দেখতে ইচ্ছা করে অনেকেরই। প্রাক্তন কেমন আছেন, নতুন জীবনে এগিয়ে গেছেন কি না কিংবা বিচ্ছেদের পর কতটা বদলেছেন—এসব জানার কৌতূহল থেকেই তৈরি হতে পারে এই অভ্যাস। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে কাজ করতে পারে পুরোনো আবেগ, কৌতূহল ও সামাজিক তুলনার মতো নানা বিষয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বেঙ্গালুরুর মার্গা মাইন্ড কেয়ারের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সুহাস কে. এ বিষয়ে কয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখার অর্থ সব সময় সম্পর্কে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা নয়। অনেক সময় এটি অভ্যাস, কৌতূহল কিংবা বিচ্ছেদের পর মনের মধ্যে রয়ে যাওয়া প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কেন কাটতে চায় না প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখার অভ্যাস?
১. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার চোখে পড়া
প্রাক্তনের ছবি, পুরোনো পোস্ট, পারস্পরিক বন্ধুদের স্টোরি কিংবা অ্যাকাউন্টের সাজেশন—এসবের মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃতভাবেও তাঁর কথা মনে পড়ে যেতে পারে। ফলে কৌতূহল তৈরি হয় এবং অনেকেই নিজে থেকেই প্রোফাইলটি দেখতে শুরু করেন।
২. নিজের সঙ্গে প্রাক্তনের তুলনা করা
বিচ্ছেদের পর কেউ কেউ জানতে চান, প্রাক্তন কতটা সুখে আছেন, নতুন জীবনে কতটা এগিয়েছেন কিংবা সামাজিকভাবে কতটা সক্রিয়। এসব দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা ছবি বা পোস্ট কারও জীবনের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না।
৩. পুরোনো আবেগ ও উত্তর খোঁজার চেষ্টা
সম্পর্ক শেষ হলেও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনুভূতি সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। বিচ্ছেদ কেন হলো, প্রাক্তন এখনো আগের সম্পর্কের কথা ভাবেন কি না কিংবা তিনি কত দ্রুত সামনে এগিয়ে গেছেন—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেও কেউ কেউ বারবার প্রোফাইল দেখেন। তবে এসব তথ্য দেখলেই মনের সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।
৪. কিছু বাদ পড়ে যাওয়ার ভয়
ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা ফোমো (FOMO)। প্রাক্তনের জীবনে নতুন কিছু ঘটছে, অথচ তা জানা হচ্ছে না—এমন অনুভূতি থেকেও বারবার প্রোফাইল দেখার তাগিদ তৈরি হতে পারে। সময়ের সঙ্গে এই আচরণ দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কীভাবে এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসবেন?
মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ অনুযায়ী, কয়েকটি সহজ পদক্ষেপ কাজে লাগতে পারে।
- কখন দেখতে ইচ্ছা করে, তা খেয়াল করুন: একাকীত্ব, একঘেয়েমি, পুরোনো স্মৃতি কিংবা বন্ধুদের পোস্ট—কোন বিষয়টি আপনাকে প্রাক্তনের প্রোফাইলে নিয়ে যায়, তা বোঝার চেষ্টা করুন।
- প্রয়োজনে মিউট বা আনফলো করুন: প্রাক্তনের পোস্ট ও স্টোরি কম দেখলে অনাকাঙ্ক্ষিত স্মৃতি এবং তুলনা করার প্রবণতা কমতে পারে।
- ইচ্ছা হলেই সঙ্গে সঙ্গে দেখবেন না: ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এ সময় হাঁটাহাঁটি, গান শোনা, বই পড়া কিংবা বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার মতো কাজে মনোযোগ দিতে পারেন।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে পুরো বাস্তবতা ভাববেন না: মানুষ সাধারণত নিজের জীবনের বাছাই করা মুহূর্তগুলোই অনলাইনে প্রকাশ করেন। তাই প্রাক্তনের পোস্ট দেখে তাঁর জীবনের পুরো পরিস্থিতি বিচার করা ঠিক নয়।
- দেখার পর নিজের অনুভূতি বুঝুন: প্রোফাইল দেখার পর যদি মন খারাপ, ঈর্ষা, উদ্বেগ কিংবা ঘুমের সমস্যা বাড়ে, তাহলে কিছুদিন দূরত্ব বজায় রাখা উপকারী হতে পারে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৭৬২ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রাক্তনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম ইচ্ছাকৃতভাবে অনুসরণ করার সঙ্গে বিচ্ছেদজনিত মানসিক কষ্ট, নেতিবাচক অনুভূতি ও ঈর্ষার সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকেরা বলেছেন, প্রাক্তনের পোস্ট কম দেখা, মিউট করা বা আনফলো করা মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়ায় সহায়ক হতে পারে। তবে গবেষণায় পাওয়া সম্পর্ক মানেই সবার ক্ষেত্রে একই ফল হবে, এমন নয়।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন?
প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, বারবার উদ্বেগ তৈরি করে, ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় কিংবা পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ নষ্ট করে, তাহলে কাউন্সেলর বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।
সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর পুরোনো স্মৃতি মনে পড়া অস্বাভাবিক নয়। তবে নিজের মানসিক শান্তি ও দৈনন্দিন জীবনের যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাক্তনের জীবনে কী ঘটছে, তা জানার চেয়ে নিজের জীবন ও ভালো থাকার দিকে মনোযোগ দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে বেশি সহায়ক হতে পারে।

রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬
সম্পর্ক ভেঙে গেছে, যোগাযোগও বন্ধ। তবু হঠাৎ ফোন হাতে নিয়ে প্রাক্তনের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল দেখতে ইচ্ছা করে অনেকেরই। প্রাক্তন কেমন আছেন, নতুন জীবনে এগিয়ে গেছেন কি না কিংবা বিচ্ছেদের পর কতটা বদলেছেন—এসব জানার কৌতূহল থেকেই তৈরি হতে পারে এই অভ্যাস। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে কাজ করতে পারে পুরোনো আবেগ, কৌতূহল ও সামাজিক তুলনার মতো নানা বিষয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বেঙ্গালুরুর মার্গা মাইন্ড কেয়ারের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সুহাস কে. এ বিষয়ে কয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখার অর্থ সব সময় সম্পর্কে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা নয়। অনেক সময় এটি অভ্যাস, কৌতূহল কিংবা বিচ্ছেদের পর মনের মধ্যে রয়ে যাওয়া প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কেন কাটতে চায় না প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখার অভ্যাস?
১. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার চোখে পড়া
প্রাক্তনের ছবি, পুরোনো পোস্ট, পারস্পরিক বন্ধুদের স্টোরি কিংবা অ্যাকাউন্টের সাজেশন—এসবের মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃতভাবেও তাঁর কথা মনে পড়ে যেতে পারে। ফলে কৌতূহল তৈরি হয় এবং অনেকেই নিজে থেকেই প্রোফাইলটি দেখতে শুরু করেন।
২. নিজের সঙ্গে প্রাক্তনের তুলনা করা
বিচ্ছেদের পর কেউ কেউ জানতে চান, প্রাক্তন কতটা সুখে আছেন, নতুন জীবনে কতটা এগিয়েছেন কিংবা সামাজিকভাবে কতটা সক্রিয়। এসব দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা ছবি বা পোস্ট কারও জীবনের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না।
৩. পুরোনো আবেগ ও উত্তর খোঁজার চেষ্টা
সম্পর্ক শেষ হলেও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনুভূতি সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। বিচ্ছেদ কেন হলো, প্রাক্তন এখনো আগের সম্পর্কের কথা ভাবেন কি না কিংবা তিনি কত দ্রুত সামনে এগিয়ে গেছেন—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেও কেউ কেউ বারবার প্রোফাইল দেখেন। তবে এসব তথ্য দেখলেই মনের সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।
৪. কিছু বাদ পড়ে যাওয়ার ভয়
ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা ফোমো (FOMO)। প্রাক্তনের জীবনে নতুন কিছু ঘটছে, অথচ তা জানা হচ্ছে না—এমন অনুভূতি থেকেও বারবার প্রোফাইল দেখার তাগিদ তৈরি হতে পারে। সময়ের সঙ্গে এই আচরণ দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কীভাবে এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসবেন?
মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ অনুযায়ী, কয়েকটি সহজ পদক্ষেপ কাজে লাগতে পারে।
- কখন দেখতে ইচ্ছা করে, তা খেয়াল করুন: একাকীত্ব, একঘেয়েমি, পুরোনো স্মৃতি কিংবা বন্ধুদের পোস্ট—কোন বিষয়টি আপনাকে প্রাক্তনের প্রোফাইলে নিয়ে যায়, তা বোঝার চেষ্টা করুন।
- প্রয়োজনে মিউট বা আনফলো করুন: প্রাক্তনের পোস্ট ও স্টোরি কম দেখলে অনাকাঙ্ক্ষিত স্মৃতি এবং তুলনা করার প্রবণতা কমতে পারে।
- ইচ্ছা হলেই সঙ্গে সঙ্গে দেখবেন না: ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এ সময় হাঁটাহাঁটি, গান শোনা, বই পড়া কিংবা বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার মতো কাজে মনোযোগ দিতে পারেন।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে পুরো বাস্তবতা ভাববেন না: মানুষ সাধারণত নিজের জীবনের বাছাই করা মুহূর্তগুলোই অনলাইনে প্রকাশ করেন। তাই প্রাক্তনের পোস্ট দেখে তাঁর জীবনের পুরো পরিস্থিতি বিচার করা ঠিক নয়।
- দেখার পর নিজের অনুভূতি বুঝুন: প্রোফাইল দেখার পর যদি মন খারাপ, ঈর্ষা, উদ্বেগ কিংবা ঘুমের সমস্যা বাড়ে, তাহলে কিছুদিন দূরত্ব বজায় রাখা উপকারী হতে পারে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৭৬২ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রাক্তনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম ইচ্ছাকৃতভাবে অনুসরণ করার সঙ্গে বিচ্ছেদজনিত মানসিক কষ্ট, নেতিবাচক অনুভূতি ও ঈর্ষার সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকেরা বলেছেন, প্রাক্তনের পোস্ট কম দেখা, মিউট করা বা আনফলো করা মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়ায় সহায়ক হতে পারে। তবে গবেষণায় পাওয়া সম্পর্ক মানেই সবার ক্ষেত্রে একই ফল হবে, এমন নয়।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন?
প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, বারবার উদ্বেগ তৈরি করে, ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় কিংবা পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ নষ্ট করে, তাহলে কাউন্সেলর বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।
সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর পুরোনো স্মৃতি মনে পড়া অস্বাভাবিক নয়। তবে নিজের মানসিক শান্তি ও দৈনন্দিন জীবনের যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাক্তনের জীবনে কী ঘটছে, তা জানার চেয়ে নিজের জীবন ও ভালো থাকার দিকে মনোযোগ দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে বেশি সহায়ক হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন